Homeঅর্থনীতিনতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৭০ শতাংশ: মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন উদ্যোক্তারা

নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৭০ শতাংশ: মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন উদ্যোক্তারা

বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশে একেবারে নতুন বিদেশি মূলধন বা নিট ইক্যুইটি বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে গেছে। একই সাথে সামগ্রিক নিট এফডিআইও কমেছে প্রায় ৪৪ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পুরোনো বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের অর্জিত মুনাফা পুনঃবিনিয়োগ করলেও নতুন বিদেশি উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে নতুন প্রকল্প শুরু করতে আগ্রহ হারাচ্ছেন, যা দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে দেশে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৭ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এক বছরের ব্যবধানে এই মূলধন প্রবাহ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কমে গেছে। একই সময়ে নতুন ইক্যুইটি, পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ মিলিয়ে মোট নিট এফডিআই দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলারে, যা আগের বছরের প্রথম প্রান্তিকে ছিল ৭৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলার।

পুরোনোদের ভরসা, নতুনদের অনীহা

অর্থনীতিবিদদের মতে, মোট এফডিআইয়ের চেয়ে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটিই নতুন কারখানা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির চিত্র নির্দেশ করে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে পুরোনো কোম্পানিগুলোর পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ বেড়ে ৩৪ কোটি ২৯ লাখ ডলারে পৌঁছেছে (আগের বছর ছিল ১৯ কোটি ১২ লাখ ডলার)। অর্থাৎ, বর্তমান এফডিআইয়ের বড় অংশই আসছে পুরোনো বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে, কোনো নতুন উদ্যোক্তা আসছে না।

কেন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা?

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণগুলো হলো:

রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা: বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অপেক্ষার অবস্থানে রেখেছিল। ঋণমানের অবনতি: আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের সোভারেন ক্রেডিট রেটিং বা সার্বভৌম ঋণমান একাধিকবার অবনমিত হওয়া বিশ্ববাজারে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা: দেশের ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং আর্থিক খাতের স্বচ্ছতার অভাব বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করছে। মুনাফা স্থানান্তরে জটিলতা: দেশে অর্জিত মুনাফা সহজে নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যাওয়া এবং ডলার সংকটের কারণে বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উগান্ডা-ঘানার চেয়েও পিছিয়ে বাংলাদেশ

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’ অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশ আফ্রিকার তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে এফডিআই এসেছে মাত্র ১.৮ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে উগান্ডা ৩.৪ বিলিয়ন এবং ঘানা ও ডিআর কঙ্গো ১.৯ বিলিয়ন ডলার করে বিনিয়োগ টানতে পেরেছে।

আঙ্কটাড জানায়, ঘানা নতুন সরকার আসার পর কর বাতিল ও ন্যূনতম মূলধনের বাধ্যবাধকতা তুলে নিয়েছে; উগান্ডা কার্যকর ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালু করেছে এবং কঙ্গো বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাত উন্মুক্ত করেছে। অপরদিকে বাংলাদেশ এখনও প্রশাসনিক জটিলতা, জ্বালানি সংকট, উচ্চ ব্যবসা ব্যয় ও নীতিগত অনিশ্চয়তার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

বিশেষজ্ঞদের মত ও প্রতিকার

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা ও জরুরি সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের প্রধান বাধা রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, সরকারের ১.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা ইতিবাচক হলেও কেবল প্রণোদনা দিয়ে বিনিয়োগ আসবে না। এর জন্য বে-টার্মিনালের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প ও আন্তর্জাতিক মানের লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, নতুন সরকার যদি দ্রুত প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের নতুন শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য