যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। গতকাল ইরানের পাঁচ প্রদেশে ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনের পর কাতার-জর্ডানেও হামলা চালিয়েছে ইরান। এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে আবারও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তান, কাতারসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ। তবে ইরান আত্মরক্ষার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি বলে কঠোর বার্তা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
গতকালও ইরানের পাঁচটি প্রদেশে ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব এলাকায় অন্তত সাতটি বিকট বিস্ফোরণের খবর দিয়েছে ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো। দেশটির মেহের নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাত বিস্ফোরণের মধ্যে দুটি ঘটেছে দক্ষিণ ইরানের প্রধান শহর বুশেহর এবং সংলগ্ন চোঘাদাক শহরে। এর মধ্যে বুশেহরে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন জাতীয় সমরাস্ত্রকে আটকে দিয়েছে ইরানি এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। দক্ষিণাঞ্চলীয় কানারাকেও দুটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে সেখানে বোমা ফেলে শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান। বাকি তিনটি বিস্ফোরণ সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।
জবাবে কুয়েত-বাহরাইনসহ গতকাল কাতার ও জর্ডানে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এবারের হামলায় কুয়েতের মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, কাতারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বিষয়ক পূর্ব সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর একটি জ্বালানি ডিপোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
পরে এক বিবৃতিতে কুয়েত সরকার জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে কুয়েতকে লক্ষ্য একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১০টি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছিল এবং সবগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে কুয়েতে একজন নিহত হয়েছেন। জর্ডানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তাসংস্থা জানিয়েছে, পূর্বাঞ্চলীয় শহর আজরাকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ঘাঁটি লক্ষ্য করে বৃহস্পতিবার রাতে ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল ইরান। এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ব্যবহার করে সেগুলোর মধ্যে আটটিকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই ধ্বংস করে দিয়েছে। বাকি দুটিকে আটকানো সম্ভব না হলেও আজরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে কোনো প্রাণহানি বা কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেও উত্তেজনা কমিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান, কাতারসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ। উভয় পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে ফেরাতে গত বুধবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একাধিক ফোনালাপের ব্যবস্থা করে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো। মধ্যস্থতায় জড়িত একটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, প্রথমে উভয় পক্ষকে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে সম্মত করানো এবং এরপর কারিগরি পর্যায়ের পরবর্তী বৈঠকের তারিখ নির্ধারণে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে।
আমাকে হত্যার ছক কষছে ইরান, ট্রাম্প : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান তাকে হত্যা করতে পারে। ইরানের হত্যার তালিকায় তিনি এক নম্বরে রয়েছেন। এই আশঙ্কায় তুরস্ক থেকে দেশে ফেরার সময় তিনি বিমান পরিবর্তন করেন। ট্রাম্পের আশঙ্কা, মাঝ আকাশে তার বিমানে হামলা হতে পারে। তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার সময় ট্রাম্প সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের বলেন, আপনারা সম্ভবত একটি বিপজ্জনক বিমানে রয়েছেন। তারা খুব বাজে লোক। আমাকে সবসময়ই হুমকির মুখে থাকতে হয়। তাদের হত্যার তালিকায় একেবারে প্রথমেই রয়েছি আমি। আমার যদি কিছু হয়, তবে আপনাদেরও একই অবস্থা হবে। তুরস্কে যাওয়ার সময় যে বিমানে ছিলেন, দেশে ফেরার পথে সেই বিমান ব্যবহার করেননি ট্রাম্প। সম্প্রতি কাতারের দেওয়া একটি বিমানে তিনি তুরস্কে গিয়েছিলেন। তবে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, ফেরার পথে তিনি কিছু দূর পুরোনো হালকা নীল রঙের প্রেসিডেন্টের বিশেষ বিমানে ভ্রমণ করেন।
আত্মরক্ষার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ইরান, আরাগচি : যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অব্যাহত থাকলে আত্মরক্ষার জন্য ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। গতকাল পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে তিনি টেলিফোনে কথা বলেন। এ সময় আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলেন, এসব বক্তব্য চুক্তি লঙ্ঘনের স্পষ্ট ইঙ্গিত এবং ওয়াশিংটনের যুদ্ধমুখী নীতির ধারাবাহিকতা। ফোনালাপে তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য যেকোনো বেপরোয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে সতর্ক করেন।
যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, নেতানিয়াহু : ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে দেশটির সেনাপ্রধান জানিয়েছেন, সামনে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান হতে পারে। ইসরায়েলের হাতজেরিম বিমানঘাঁটিতে বিমানবাহিনীর স্নাতক সমাপনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আকাশে আধিপত্য বজায় রাখা ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অন্যতম ভিত্তি। অস্থির মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসরায়েলের সেনাপ্রধান ইয়াল জামিরও বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান এখনো শেষ হয়নি। নতুন পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে। সামনে আরও বড় ধরনের সামরিক অভিযান হতে পারে। সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজও বলেছেন, প্রয়োজন হলে ইরানের ওপর আবারও হামলা চালাতে তাদের সেনাবাহিনী প্রস্তুত। আকাশে আবারও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারও ইরানে হামলা চালিয়ে হুমকি দূর করতে তারা প্রস্তুত।


