লন্ডনের গণপরিবহন ব্যবস্থা ‘ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডন’ (TfL)-এর কম্পিউটার সিস্টেমে ২০২৪ সালের একটি বড় সাইবার হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২০ বছর বয়সী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি তরুণ তালহা জুবায়ের দোষ স্বীকার করেছেন। চাঞ্চল্যকর এই হ্যাকিংয়ের ঘটনায় TfL-এর প্রায় ৩৯ মিলিয়ন পাউন্ড বা প্রায় ৬০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের বো এলাকার বাসিন্দা জুবায়ের গত মাসে উলউইচ ক্রাউন কোর্টে হাজির হয়ে অপরাধের কথা স্বীকার করেন। এই মামলায় তাঁর সাথে ওয়েন ফ্লাওয়ার্স নামের আরেক ১৮ বছর বয়সী তরুণও দোষ স্বীকার করেছেন। গোয়েন্দাদের ধারণা, এই দুজনেই ‘স্ক্যাটার্ড স্পাইডার’ নামক একটি কুখ্যাত আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্রের সক্রিয় সদস্য।
যেভাবে হামলা চালানো হয় ও ক্ষতির পরিমাণ ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে TfL-এর কম্পিউটার সিস্টেমে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করে এই সাইবার হামলা চালানো হয়। এর ফলে লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড টিউব ও বাসসহ বিভিন্ন পরিবহন সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যা প্রতিদিন যাতায়াত করা লক্ষ লক্ষ যাত্রীকে চরম ভোগান্তিতে ফেলে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, আক্রান্ত কম্পিউটার সিস্টেম পুনরুদ্ধার এবং সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করতে কর্তৃপক্ষের প্রায় ৩৯ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় হয়েছে।
খাবারের অর্ডারে হ্যাকার শনাক্ত তদন্তকারীরা জানান, জুবায়ের নিজেকে আড়াল করতে উচ্চমানের ভিপিএন (VPN) এবং বিশেষ ধরনের অ্যামনেসিয়াক অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করেছিলেন। নিখুঁতভাবে নিজের ডিজিটাল পদচিহ্ন মুছে ফেললেও শেষ রক্ষা হয়নি। তাঁর ফ্ল্যাটে করা একটি অনলাইন ফুড অর্ডারের সূত্র ধরে তদন্তকারীরা তাঁর সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হন।
পরবর্তীতে জুবায়েরের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে একটি গোপন বাংলাদেশি পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ধারণা, আইনি জটিলতা এড়াতে যুক্তরাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য এই পাসপোর্ট তৈরি রাখা হয়েছিল। শুধু যুক্তরাজ্যই নয়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই (FBI)-এর তদন্তে দেখা গেছে যে আমেরিকার বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলা ও ব্ল্যাকমেলিংয়ের সাথেও জুবায়ের সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
২২টি অপরাধ ও সাজার অপেক্ষায় আসামিরা জুবায়েরের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের কম্পিউটার মিসইউজ অ্যাক্টের অধীনে অননুমোদিত কম্পিউটার অ্যাক্সেস, জালিয়াতি বা ফ্রডসহ মোট ২২টি সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। লন্ডনের আদালত আগামী ১৬ জুলাই জুবায়ের এবং তাঁর সহযোগী ফ্লাওয়ার্সের চূড়ান্ত সাজা ঘোষণা করবে। এই ধরনের বড় মাপের রাষ্ট্রীয় ক্ষতিসাধনের জন্য হ্যাকারদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই সাইবার অপরাধীরা বেশ কিছুদিন ধরেই পুলিশের নজরদারিতে ছিল। এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্বকে আরও একবার সামনে এনেছে। প্রযুক্তির এমন মারাত্মক অপব্যবহার রোধে বিশেষজ্ঞরা নতুন প্রজন্মকে সাইবার অপরাধের পথ পরিহার করে প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন।


