Homeঅপরাধবেপরোয়া কিশোর গ্যাং: দেশজুড়ে বাড়ছে আতঙ্ক, নেপথ্যে রাজনৈতিক ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ইন্ধন

বেপরোয়া কিশোর গ্যাং: দেশজুড়ে বাড়ছে আতঙ্ক, নেপথ্যে রাজনৈতিক ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ইন্ধন

বর্তমানে দেশের শহুরে সমাজে এক বড় আতঙ্কের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে উঠতি বয়সী এসব তরুণের দৌরাত্ম্য। দল বেঁধে চলাচল করা, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও নিজেদের তথাকথিত ‘হিরোইজম’ জাহির করতে গিয়ে এরা জড়িয়ে পড়ছে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক কারবার এবং খুনাখুনির মতো ভয়ংকর অপরাধে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে কেন্দ্র করে পাড়া-মহল্লায় এই গ্যাং কালচার আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এর পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে স্থানীয় প্রভাবশালী, স্বার্থান্বেষী মহল এবং কিছু রাজনৈতিক নেতা। এমনকি সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর ছত্রছায়ায় থেকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় তাণ্ডব চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অপরাধের হটস্পট মোহাম্মদপুর ও দেশজুড়ে গ্যাংয়ের তালিকা রাজধানীতে অপরাধের মূল কেন্দ্র বা হটস্পট হয়ে উঠেছে মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকা। বিশেষ করে জেনেভা ক্যাম্প এখন মাদকের স্বর্গরাজ্য। মোহাম্মদপুর এলাকায় সক্রিয় গ্যাংগুলোর মধ্যে রয়েছে—ডাইল্লা গ্রুপ, এলেক্স গ্রুপ, ইমন গ্রুপ, শুটার আনোয়ার গ্রুপ, আকাশ গ্রুপ, দ্য কিং অব লও ঠেলা, ডায়মন্ড গ্রুপ, আই ডোন্ট কেয়ার (আইডিসি), মুরগি গ্রুপ এবং কোপাইয়া দে গ্রুপসহ আরও বেশ কয়েকটি চক্র।

এছাড়া রাজধানীর অন্যান্য এলাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় সক্রিয় প্রধান গ্যাংগুলো হলো: উত্তরা: নাইন স্টার, পাওয়ার বয়েজ, বিল বস, নাইন এম এম বয়েজ, ভাইপার, তুফান। মিরপুর: সুমন গ্যাং, পিচ্চি বাবু, বিহারি রাসেল, বিচ্চু বাহিনী, রিপন গ্যাং, নয়ন গ্যাং। ধানমন্ডি: একে ৪৭, নাইন এম এম, ফাইভ স্টার বন্ড। পুরান ঢাকা ও অন্যান্য: বংশালে জুম্মন গ্যাং, তেজগাঁওয়ে মাঈনুদ্দিন গ্যাং এবং সদরঘাট ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ফেরদৌস গ্রুপ, সাজু গ্রুপ ও চিতা গ্রুপ। ঢাকার বাইরে: কুমিল্লায় আলোচিত ‘রতন গ্রুপ’, এছাড়া গাজীপুর, ফরিদপুর ও সিলেটেও একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।

সাম্প্রতিক কিছু ভয়ংকর অপরাধচিত্র

মোহাম্মদপুর জোড়া খুন: গত ২২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রায়েরবাজার সাদেক খান কাঁচাবাজার এলাকায় ‘ডাইল্লা গ্রুপ’ ও ‘এলেক্স গ্রুপের’ মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষে নাসির ও মুন্না নামের দুই যুবক নিহত হন। লালবাগে নৃশংস হত্যাকাণ্ড: গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে লালবাগের জেএন সাহা রোডে পূর্ববিরোধের জেরে মাহবুব নামের এক তরুণকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে কিশোর গ্যাং সদস্য মাঈন উদ্দিনসহ একদল সন্ত্রাসী। গাজীপুরে ব্যবসায়ী হত্যা: ১ জানুয়ারি রাতে গাজীপুরের শ্রীপুরে কিশোর গ্যাং সদস্যদের হামলায় ফার্মেসি ব্যবসায়ী হাসিবুল ইসলাম বাদশা নিহত হন। এ সময় তারা নিহতের বাড়িতে ঢুকে নারী সদস্যদেরও লাঞ্ছিত করে। কুমিল্লায় অস্ত্রের মহড়া ও খুন: ৩ জানুয়ারি কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের সামনে ‘রতন গ্রুপের’ ৩০-৩৫ জন সদস্য চাপাতি, চায়নিজ কুড়াল ও রামদাসহ প্রকাশ্যে বোমাবাজি ও অস্ত্রের মহড়া দেয়। এর আগে মাদক কারবারের জেরে সজীব হোসেন নামের এক তরুণকে কুপিয়ে হত্যা করে এই চক্রের সদস্যরা। আদাবরে গণহামলা: ৩ জানুয়ারি আদাবর বাজার এলাকায় দেশি অস্ত্র নিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের মহড়ায় বাধা দেওয়ায় এলাকাবাসীর ওপর হামলায় অর্ধশতাধিক স্থানীয় বাসিন্দা আহত হন। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতা হাসু ও কাসু পালিয়ে যাওয়ার পর তাদের ভাই স্বাধীনের ইন্ধনে ডিবি সুমনের নেতৃত্বে এই ত্রাস সৃষ্টি করা হচ্ছে।

যা বলছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিশোর অপরাধীরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে আরও বেশি হিংস্র হয়ে উঠেছে। তারা সংঘবদ্ধভাবে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করছে এবং শারীরিক নির্যাতন চালাচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, ভাসমান ও বস্তি এলাকার কিশোরদের বখাটেপনা এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের কিশোরদের অপরাধের ধরন ভিন্ন হলেও, দেশে আইনের শাসনের ঘাটতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতার কারণে এই অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। প্রতিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আইনে কিশোরদের ক্ষেত্রে শাস্তির চেয়ে সংশোধনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে সবার আগে রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। সমাজ ও পরিবারের দায়িত্বশীল নাগরিকদেরও সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে, অন্যথায় এর প্রভাব পুরো সমাজকে ভোগ করতে হবে।”

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য