টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। জেলার সাতটি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে। জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার (১০ জুলাই) পর্যন্ত বন্যাকবলিত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন। বর্তমানে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। উপদ্রুত এলাকাগুলোতে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত বন্যা, পাহাড়ধস ও দেয়ালচাপায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন পাঁচজন।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায়। এ ছাড়াও হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়া উপজেলার লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
অন্ধকারে কাঁপছে সাতকানিয়া ও বাঁশখালী
বন্যা পরিস্থিতি সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে সাতকানিয়া উপজেলায়। এখানকার ১৭টি ইউনিয়নের সবকটিই এখন পানির নিচে এবং চার লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়িতে আটকা পড়েছেন। বাঁশখালী উপজেলার উপকূলীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় সব ইউনিয়ন পুরোপুরি প্লাবিত হয়েছে। অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং পাকা ভবনের নিচতলায় কোমরসমান পানি জমেছে। অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র ও নৌকায় আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে ঘরের টিনের ছাদে দিন কাটাচ্ছেন।
গত কয়েক দিন ধরে এই দুই উপজেলায় বিদ্যুৎ সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় অধিকাংশ পরিবার অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও চার্জ না থাকায় অনেকেই স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করতে পারছেন না। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দুর্গম এলাকাগুলোতে এখনও পর্যাপ্ত সরকারি ত্রাণ পৌঁছায়নি।
দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজে নামছে সেনাবাহিনী
দুর্গত এলাকায় সাধারণ নৌকা পৌঁছাতে না পারায় জেলা প্রশাসনের অনুরোধে আজ শনিবার (১১ জুলাই) থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্পিডবোট নিয়ে উদ্ধার অভিযানে নামছে। সাতকানিয়া, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে উদ্ধারকাজে যোগ দিয়েছে। এছাড়া সন্দ্বীপে কোস্টগার্ড এবং অন্যান্য এলাকায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকেরা কাজ করছেন।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা গতকাল সাতকানিয়ার বন্যাকবলিত ঢেমশা ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি সবার কাছে ত্রাণ না পৌঁছানোর কথা স্বীকার করে বলেন, দুর্গম অঞ্চলগুলোতে স্পিডবোট ব্যবহার করে খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়া হবে। জেলার ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে এবং সেখানে ২৩ হাজার ৮৫০ জন আশ্রয় নিয়েছেন।
সরকারি ত্রাণ ও বর্তমান পরিস্থিতি
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যার্তদের জন্য এ পর্যন্ত ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৩ লাখ টাকা এবং হাজার হাজার শুকনো ও রান্না করা খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলার জন্য বিশেষভবে ২৫ মেট্রিক টন চাল ও ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমতে শুরু করেছে। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি আরও উন্নত হতে পারে। তবে আজ শনিবার সাংগু নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে সমন্বয় করে স্লুইসগেট ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখার চেষ্টা চলছে।


