বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান ও সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) দেশের অবস্থান নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় এই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমেছে। একই সঙ্গে আশঙ্কাজনক হারে কমেছে বাংলাদেশি পোশাকের গড় রপ্তানি মূল্যও।
ইইউতে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে রয়েছে চীন, বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত প্রথম পাঁচ মাসে এই শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি সর্বোচ্চ ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ (প্রায় ১৯ শতাংশ) কমেছে। একই সময়ে শীর্ষ রপ্তানিকারক চীনের রপ্তানি কমেছে মাত্র ৪ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে এই হ্রাসের হার মাত্র দেড় শতাংশ।
আয় ও পরিমাণ উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধাক্কা
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ইইউর সামগ্রিক তৈরি পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে ৩৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে। এই মন্দার বাজারে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে ৭ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ কম। শুধু রপ্তানি মূল্যই নয়, পরিমাণের দিক থেকেও বাংলাদেশ বড় ধাক্কা খেয়েছে। আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৫২ কোটি কেজি তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ কম।
অন্যদিকে, একই সময়ে চীন ইইউতে ৯ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। প্রতিযোগী অন্য দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কের রপ্তানি ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ, ভারতের ১৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ১০ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ১৭ শতাংশ কমেছে।
কমেছে গড় মূল্য, পিছিয়ে বাংলাদেশ
পোশাকের গড় মূল্য কমার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান বৈশ্বিক বাজারে বেশ নাজুক। জানুয়ারি-মে সময়ে ইইউর আমদানি করা প্রতি কেজি তৈরি পোশাকের গড় মূল্য ছিল ১৯ দশমিক ৬৯ ইউরো। সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি করা পোশাকের গড় মূল্য ছিল মাত্র ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরো, যা আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ কম। গড় মূল্য কমার এই দৌড়ে বাংলাদেশের আগে রয়েছে শুধু পাকিস্তান, যাদের পণ্যের মূল্য কমেছে ১৯ শতাংশ।
বিপরীতে, সবচেয়ে বেশি ২৯ দশমিক ৪৪ ইউরো গড় মূল্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে ভিয়েতনাম, যা আগের বছরের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া তুরস্কের গড় মূল্য ১ দশমিক ৮১ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়েছে।
অভ্যন্তরীণ সংকট ও বৈশ্বিক যুদ্ধই মূল কারণ
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা বলছেন, ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে নিত্যপণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্যের চাহিদা কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে সার্বিক আমদানিতে। তবে প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি ও পণ্যের দাম এতটা বেশি কমে যাওয়া অভ্যন্তরীণ সংকটের দিকেই আঙুল তুলছে।
জানতে চাইলে তুসুকা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি আরশাদ জামাল বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের কারণে ইইউর ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রয়াদেশ কম দিয়েছে। এরপর বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকের বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে অনেক মাঝারি কারখানা কাঁচামাল আমদানির জন্য ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র (এলসি) খুলতে পারেনি। তার ওপর গ্যাস-বিদ্যুতের মারাত্মক সংকটও তীব্রভাবে ভোগাচ্ছে। এসব কারণে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলাদেশের আকর্ষণ ক্রমান্বয়ে কমছে।
আরশাদ জামাল আরও যোগ করেন, ব্যবসার সামগ্রিক পরিস্থিতি খারাপ থাকায় টিকে থাকার লড়াইয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে কম দামে ক্রয়াদেশ নেওয়ার একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এর ফলেই রপ্তানি হওয়া তৈরি পোশাকের দাম বাজারে অস্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি ও এই শিল্পের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনছে।


