বিদেশে উন্নত চিকিৎসার আড়ালে দেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হয়ে যাচ্ছে। সরকারের নীতিগত কড়াকড়ি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতার সুযোগ নিয়ে সাধারণ রোগী ও একশ্রেণির অসাধু চক্র বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে হুন্ডির মাধ্যমে এই অর্থ বিদেশে পাঠাচ্ছে। যার ফলে দেশ হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।
সম্প্রতি গত ১১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এনে বলেন, “প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে প্লাস–মাইনাস ফাইভ বিলিয়ন ডলার চলে যাচ্ছে বিদেশে চিকিৎসার জন্য। আমাদের দেশের বহু মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন চিকিৎসা করাতে। তার ফলে আমাদের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রাও সেই সাথে চলে যাচ্ছে।”
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক কড়াকড়ি শিথিলের পর বৈধ পথে চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর পরিমাণ গত চার বছরে ৩৪ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে এই বৈধ অর্থ মোট ব্যয়ের খুবই নগণ্য অংশ। প্রতিবছর বাংলাদেশিদের বিদেশে চিকিৎসা বাবদ যে ৪০০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি (৪ থেকে ৫ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় হয়, তার সিংহভাগই পর্যটন ভিসার আড়ালে কিংবা অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ হুন্ডি চক্রের মাধ্যমে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের ভিসা প্রাপ্তিতে দীর্ঘ জটিলতা তৈরি হয়। ফলে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশিরা ভারতের বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো ব্যয়বহুল দেশগুলোকে বেছে নিচ্ছেন। এসব দেশে চিকিৎসার খরচ যেমন বেশি, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দাম বাড়ায় টাকার বিপরীতে খরচও বেড়েছে কয়েক গুণ।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বানুমতি ছাড়াই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ছাড় করার অনুমতি দেয়। হাসপাতালের নামে সরাসরি কিংবা আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে এই ডলার খরচ করা যাচ্ছে, যার মধ্যে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত নগদ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে এই উদ্যোগকে ইতিবাচক বললেও ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অর্থ পাচার ও হুন্ডি পুরোপুরি বন্ধে যথেষ্ট নয়। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ জানান, নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি অর্থের প্রয়োজন হলে গ্রাহকেরা সাধারণত বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ অনুমোদনের দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় যেতে চান না। তারা দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত উপায়ে অর্থ পরিশোধের জন্য বিকল্প অবৈধ পথ তথা হুন্ডির আশ্রয় নেন। তাঁর মতে, চিকিৎসকের প্রকৃত ব্যবস্থাপত্র ও হাসপাতালের প্রাক্কলন (এস্টিমেট) যাচাই সাপেক্ষে সম্পূর্ণ অর্থ ছাড়ের ক্ষমতা সরাসরি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দিলে চিকিৎসার নামে এই অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রবাহ ও হুন্ডির প্রবণতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।


