দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউন (কোমানি) শহরের একটি সুপারশপে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছয় বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা।
দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানরত বাংলাদেশি সূত্রের বরাত দিয়ে স্বজনরা জানান, কুইন্সটাউনের শ্রম এলাকায় একটি সুপারশপে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ সময় ভেতরে থাকা বাংলাদেশিরা বের হতে না পেরে দগ্ধ হন। এতে ঘটনাস্থলেই ছয়জনের মৃত্যু হয়।
নিহতদের মধ্যে পাঁচজন নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা হওয়ায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
স্বজনদের বুকফাটা কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ।
নিহতের পরিবারের সূত্র জানায়, আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর ভেতরে থাকা বাংলাদেশিরা বের হওয়ার সুযোগ পাননি। মুহূর্তে আগুন পুরো ভবন গ্রাস করলে ঘটনাস্থলেই ছয়জনের মৃত্যু হয়। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে এলেও স্থানীয় প্রশাসন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
নিহতরা হলেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে মো. ফাহিম (২৯), একই গ্রামের আলী মিয়ার ছেলে মো. আপন আহমেদ (২৩), নুর মোহাম্মদ (৫৫), বক্তাবলী ইউনিয়নের তৈলখিরার চর এলাকার ফারুক হোসেনের ছেলে মো. ফয়সাল (২৬), কানাইনগর এলাকার মৃত আক্তার হোসেনের ছেলে মো. শাহিন (৩০) এবং মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভার কালিন্দিপাড়া এলাকার মৃত সালাম ব্যাপারীর ছেলে মো. রাজিক (৫৫)।
ঘটনার বরাত দিয়ে আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার রওশন আলী জানান, নিহতরা সবাই আত্মীয়-স্বজন এবং দীর্ঘদিনের পরিচিত ছিলেন। যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন লেগেছে, সেটিও তাঁদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা সেখানে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন।
তিনি আরো জানান, নিহত ছয়জনের মধ্যে চারজন আলীরটেক ইউনিয়নের, একজন পার্শ্ববর্তী বক্তাবলী ইউনিয়নের, অন্যজন পার্শ্ববর্তী জেলা মুন্সীগঞ্জের রিকাবীবাজারের বাসিন্দা ছিলেন।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডে নিহত হওয়ার ঘটনায় আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামে হৃদয়বিদারক পরিবেশ তৈরি হয়। একই গ্রামের তিনজনের মৃত্যুতে পুরো গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। প্রতিটি বাড়িতে কান্নার শব্দ। কোথাও স্বজনদের বিলাপ, কোথাও বাগরুদ্ধ হয়ে বসে আছেন বৃদ্ধ মা-বাবা। প্রতিবেশীরা এসে স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কান্না থামছে না।
এই গ্রামের বাসিন্দা ফাহিম প্রায় ১১ বছর আগে সংসারের হাল ধরতে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন। পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ছিলেন তিনি। তাঁর পাঠানো টাকায় চলত পুরো সংসার। মৃত্যুর খবর শুনে বাবা মনির হোসেন নির্বাক হয়ে গেছেন। মায়ের আহাজারিতে বারবার ভারী হয়ে উঠছে বাড়ির পরিবেশ।
মাত্র চার বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান আপন আহমেদ। বয়স মাত্র ২৩ বছর। পরিবারের অনেক স্বপ্ন ছিল তাঁকে ঘিরে। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন শুধুই স্মৃতি। ছেলের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন বাবা আলী মিয়া। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে অনেক বদলে গিয়েছিল। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। সোমবার ও বৃহস্পতিবার নফল রোজা রাখত। দাড়ি রাখা শুরু করেছিল। কয়েক দিন আগেই ফোনে কথা হয়েছিল। আমাকে বলেছিল, তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে আমাদের জন্য দোয়া করে। আমি কি জানতাম, এটাই আমার ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হবে। এখন আমার সেই ছেলেটা লাশ হয়ে ফিরবে। আমি কিভাবে এটা মেনে নেব?’
বাবার এমন হৃদয়বিদারক আর্তনাদে উপস্থিত স্বজনদের অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কেউ তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ নীরবে কাঁদছেন।
নিহত আপনের মামা রাসেল বলেন, ‘বিদেশে গিয়েছিল পরিবারের ভাগ্য বদলাতে। আমরা ভেবেছিলাম একদিন হাসিমুখে দেশে ফিরবে। কিন্তু আজ শুনতে হচ্ছে সে লাশ হয়ে ফিরছে। এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে?’
অন্যদিকে নিহত নূর মোহাম্মদের পরিবারেও চলছে মাতম। বৃদ্ধ বয়সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন তিনি। নূর মোহাম্মদের খালাতো ভাই আমীর হোসেন জানান, তাঁর ঘরে দুটি সন্তান। তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই এত দূরের দেশে গিয়েছিলেন। সেই মানুষটি আর ফিরে আসবেন না!
বক্তাবলী ইউনিয়নের তৈলখিরার চর এলাকায় নিহত ফয়সালের বাড়িতেও চলছে মাতম। প্রতিবেশী আজগর আলী জানান, ফয়সাল ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও পরিশ্রমী। পরিবারের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। একইভাবে কানাইনগর এলাকায় শাহিনের বাড়িতেও চলছে স্বজনদের কান্না। ছোটবেলা থেকে সংগ্রাম করে বড় হওয়া শাহিনের এমন মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
নারায়ণগঞ্জ সদরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, ‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। তবে নিহতদের মধ্যে পাঁচজন নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা বলে জানা গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।’
এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা দ্রুত অগ্নিকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন। একই দাবি তুলেছেন নিহতদের স্বজনরাও। আলীরটেক ও বক্তাবলীর মানুষের এখন একটাই আকুতি, ছেলেরা জীবিকার সন্ধানে বিদেশে গিয়েছিলেন, অন্তত তাঁদের শেষ ঠিকানা যেন হয় নিজের জন্মভূমির মাটি। আর যেসব পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষগুলো আগুনে ঝরে গেলেন, সেই পরিবারগুলোর পাশে যেন দ্রুত দাঁড়ায় সরকার।


