Homeঅর্থনীতিজ্বালানি ও গম আমদানি বেড়েছে

জ্বালানি ও গম আমদানি বেড়েছে

চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি বেড়েছে। একই সময়ে গম আমদানিও বেড়েছে, যা বাজারে সরবরাহ বাড়াতে সহায়তা করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, এই সময়ে ৭০.৪১ বিলিয়ন ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১০.৬৮ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি বা পেট্রোলিয়াম। জ্বালানি আমদানি বেড়েছে ৬.৪২ শতাংশ। কারণ আগের বছর জ্বালানির জন্য খোলা এলসি নিষ্পত্তি হয়েছিল ১০.০৩ বিলিয়ন ডলার।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসের খনি থেকে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমছে। চাহিদা পূরণের জন্য বাধ্য হয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ওপর দেশের নির্ভরশীলতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। দেশের শিল্প-কারখানা সচল রাখতে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ঠিক রাখতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের পাশাপাশি কয়লা ও গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, জ্বালানির সঙ্গে খাদ্যপণ্য গমের এলসি নিষ্পত্তি দেড় শ কোটি ডলার থেকে বেড়ে দুই শ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে।

হিসাব অনুযায়ী এই খাদ্যপণ্যটির আমদানি এক বছরে ৩৩ শতাংশ বেড়েছে।

এ বিষয়ে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানি আমদানি বাড়লেও দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানির চরম সংকট। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, ব্যবসা প্রতিকূল করনীতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ নয়, টিকে থাকার লড়াই করছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও স্থগিত রেখেছে। এর প্রভাবে এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি কমে গেছে।

আমদানি বৃদ্ধির পাশাপাশি কয়েকটি পণ্যে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিও দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, কর্মসংস্থান তৈরির মেশিন নামে পরিচিত বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নেমে গেছে ৫ শতাংশের নিচে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানিতে। কারণ এক বছরে ১০.৬৮ শতাংশ পতন। শুধু ভোক্তা পণ্য ও মূলধনী যন্ত্রপাতি নয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মধ্যবর্তী পণ্য এবং শিল্পের কাঁচামালের এলসি নিষ্পত্তি প্রবৃদ্ধিও ছিল নেতিবাচক।

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র খোলা কমে যাওয়ার অর্থ হলো বিনিয়োগ থমকে যাওয়া। আর বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে না। ফলে অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একাধিক শিল্পোদ্যোক্তা জানান, আগের চেয়ে বিনিয়োগ এখন অনেক বেশি দামি হয়ে গেছে। একদিকে বেড়েছে ডলারের দাম, অন্যদিকে ব্যাংক সুদ হারও চড়া। এ অবস্থায় নতুন বিনিয়োগ করতে গেলে আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। আবার উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে বাজারে পণ্যের চাহিদাও কমে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭০.৪১ বিলিয়ন ডলারের এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) সেটলমেন্ট হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৭০.৩৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় মাত্র ০.০৯ শতাংশ বেশি। গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলোর মধ্যে পেট্রোলিয়াম ও খাদ্যপণ্য ছাড়া বাকিসবগুলোর এলসি নিষ্পত্তি কমেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ি অর্থবছরে ভোক্তা পণ্যের আমদানি কমেছে ৬.৯২ শতাংশ। একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে সবচেয়ে বেশি, ১০.৬৮ শতাংশ। শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি কমেছে ৬.৫১ শতাংশ এবং শিল্প কাঁচামালের আমদানি কমেছে ৩.৩৩ শতাংশ।

গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হেলাল আহমেদ জনি কালের কণ্ঠকে বলেন, সামগ্রিক অর্থনীতিতে এখনো বিনিয়োগের পরিবেশ পুরোপুরি অনুকূলে আসেনি। বাজেটের করনীতি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগ ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। ফলে এলসি খোলা হলেও অনেক ক্ষেত্রে পণ্য আমদানি ও নিষ্পত্তি পিছিয়ে যাচ্ছে। এলসি নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ব্যাংকগুলোর ট্রেজারি থেকে সব সময় পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সময়মতো বিদেশি সরবরাহকারীর কাছে অর্থ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া দেশের অনেক ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে (ক্যাপিটাল শর্টফল) রয়েছে। এসব ব্যাংকের খোলা এলসির ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংক অনেক সময় কনফার্মেশন দিতে অনাগ্রহী হয়। এতে আমদানি কার্যক্রম এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সেই সঙ্গে রপ্তানি খাতের ধীরগতির প্রভাবও এলসি নিষ্পত্তিতে পড়েছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সামগ্রিকভাবে অনেক গুরুপূর্ণ খাতে আমদানি কমলেও কিছু নির্দিষ্ট পণ্যে উল্টো ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যেখানে পেট্রোলিয়াম পণ্য ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি মোট আমদানি ব্যয়কে স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি খাদ্যশস্য, বিশেষ করে গমের আমদানিও বেড়েছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও আন্তর্জাতিক বাজারের দামের প্রভাবে হয়েছে। এ ছাড়া কিছু ভোক্তা খাদ্যপণ্য, যেমন—দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য এবং মৌসুমি চাহিদানির্ভর পণ্যের আমদানিতেও আংশিক বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। ফলে সামগ্রিকভাবে বেশির ভাগ খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও জ্বালানি ও কিছু খাদ্যপণ্যের উচ্চ আমদানি ব্যয় পুরো আমদানি চিত্রকে ভারসাম্যে রেখেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য এক কর্মকর্তা জানান, আমাদের দেশের রপ্তানি খাতের একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর। অর্থাৎ বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য তৈরি করে অন্য দেশে রপ্তানি করা হয়। কিন্তু তথ্য বলছে, মধ্যবর্তী পণ্য কমেছে ৬.৫১ শতাংশ, শিল্প কাঁচামাল আমদানি কমেছে ৩.৩৩ শতাংশ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য মতে, বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ০.৫৮ শতাংশ কমে ৪৮ বিলিয়ন (চার হাজার ৮০০ কোটি) ডলারে নেমেছে।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য