দুই বছরের বেশি সময় ধরে কার্যত বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য খোলার জোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা, মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক এবং আগামী দুই দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ঘোষণায় নতুন আশায় বুক বাঁধছেন বিদেশগামী কর্মীরা।
গত সোমবার রাতে দুই দিনের সফরে কুয়ালালামপুর গিয়েছিলেন। সফরসঙ্গী ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। গতকাল মঙ্গলবার তাঁরা মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী ভি শিবকুমার রামানানের সঙ্গে শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠক শেষে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী ভি শিবকুমার রামানান জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে আগামীকাল অথবা তার পরের দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছার বিষয়ে উভয় পক্ষই একমত।
তিনি বলেন, ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছার পর যৌথভাবে অথবা পৃথকভাবে এক ঘোষণার মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে বিষয়টি।’
রামানান জানান, বৈঠকে শ্রমিক নিয়োগের সময়সীমা, কত দ্রুত নিয়োগ শুরু করা সম্ভব, বর্তমানে কার্যকর স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি), ডিজিটাল নিয়োগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য কারিগরি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকলেও দুই দেশ শুধু এমওইউর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না।
বর্তমান শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন নতুন খাতে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান রামানান। তিনি জানান, বিশেষ করে মালয়েশিয়ার রেস্তোরাঁ খাতে বর্তমানে শ্রমিকের উল্লেখযোগ্য চাহিদা রয়েছে। পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে উভয় দেশকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে আপাতত শ্রমিক নিয়োগ ফের চালু করাটাই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার তৎপরতায় খুশি দেশটিতে কাজ করতে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিরা।দেশটিতে যেতে আগ্রহী শ্রমজীবী তুষার দুই বছর আগে থেকেই চেষ্টা করছিলেন মালয়েশিয়ায় যেতে। হঠাৎ করেই ভিসা বন্ধ হওয়ায় তাঁর আর সে দেশে যাওয়া হয়নি। দেশটিতে ভিসা আবার চালু হচ্ছে জানার পর উত্ফুল্ল তিনি। তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় ভাইয়ের দোকান আছে। দেশটিতে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় এত দিন বেকারই ছিলাম। এখন ভিসা খুললে সে দেশে কাজ করার সূযোগ পাব।’
২০২৪ সালের মে মাস থেকে বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় এবং নানা অভিযোগের পর দেশটি নতুন নিয়োগব্যবস্থা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশটির শ্রমবাজার ফের চালু হওয়ার পর ২০২২ সালে ৪৯ হাজার ৩৫৩ জন বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যান। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় তিন লাখ ৯৭ হাজার ৫৪৮ জনে। একই সময়ে ২০২২ সালে ২০ হাজার ৩৩১ জন এবং ২০২৩ সালে ২৩ হাজার ৬৫ জন বাংলাদেশি কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠান তাঁদের নিয়োগকর্তারা। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় বৈধ ওয়ার্ক পারমিটধারী বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা আট লাখ তিন হাজার ৩৩২ জন, যা দেশটিতে কর্মরত মোট বিদেশি শ্রমিকের ৩৭ শতাংশ।
মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। নির্মাণ, উৎপাদন, বাগান, সেবা ও রেস্তোরাঁ খাতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ করছেন। শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিদেশগামী কর্মীদের বড় একটি অংশ বিকল্প গন্তব্যে যেতে বাধ্য হয়। এর প্রভাব পড়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সপ্রবাহের ওপরও।


