নেপাল ও চীন সীমান্তে বরফ, পাথর এবং কাদার এক প্রলয়ঙ্করি ঢলে ভেসে গেছে একের পর এক জনপদ। কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কসংকেত ছাড়াই হঠাৎ নেমে আসা এই প্রাকৃতিক তান্ডবে এখন পর্যন্ত নেপালে ৩৮৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশ মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৭০০ জন বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে সিংহভাগই ভারতীয় নাগরিক। ২০১৫ সালের সেই বিধ্বংসী ভূমিকম্পের ১১ বছর পর হিমালয় কন্যা নেপালে এটিই সবচেয়ে বড় দুর্যোগ।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, নেপালের ৭ হাজার ২৪৫ মিটার উঁচু লাংটাং লিরুং পর্বতের ঢাল থেকে প্রায় দুই কোটি ঘনমিটার ধ্বংসাবশেষ আছড়ে পড়ে লহেন্দে নদীতে। এতে নদী আটকে তৈরি হয় এক বিশাল কৃত্রিম হ্রদ। পরবর্তীতে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে সেকেন্ডে ৫০ মিটার অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দানবীয় গতিতে কাদা-পাথরের ঢল ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী হয়ে নিচে নেমে আসে। মাত্র ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে এই ঢল তিব্বত থেকে নেপালের দেবঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল লন্ডভন্ড করে দেয়। চিরচেনা রাস্তাঘাট, সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও একের পর এক গ্রাম চোখের নিমেষে মানচিত্র থেকে মুছে যায়।
দুর্যোগে তিব্বত অংশেই নিখোঁজের সংখ্যা ৫৫৮ ছাড়িয়েছে। উদ্ধারকাজে নেপালের সেনাবাহিনী ও ৩০ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত থাকলেও রেডক্রস জানিয়েছে, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বহু দুর্গম অঞ্চলে পৌঁছানোই সম্ভব হচ্ছে না। কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতে এখন স্বজনহারাদের বুকফাটা হাহাকার। প্রিয়জনের লাশের অপেক্ষায় টিচিং হাসপাতালের সামনে ভিড় করছেন শত শত মানুষ।
বিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, দুর্যোগের ধাক্কা এখানেই শেষ নয়। গিরং এলাকার উজানে নতুন করে আরও একটি বিপজ্জনক হ্রদ তৈরি হয়েছে, যেখানে আগামী ৩ দিনে প্রায় ৫০ লাখ ঘনমিটার পানি জমার আশঙ্কা রয়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সেই কৃত্রিম বাঁধ ভেঙে দ্বিতীয় দফায় ভয়াবহ বন্যা আছড়ে পড়তে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয়ের বরফ দ্রুত গলে পাহাড়ের খাঁজ দুর্বল হয়ে পড়াতেই এই মহাবিপর্যয় ঘটেছে বলে মনে করছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।


