দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের কাছে সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা পৌঁছে দিতে সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি নতুন আর্থিক জটিলতার মুখে পড়েছে। প্রথম ধাপে ৪১ লাখ সুবিধাভোগীর হাতে ‘টাকাপে’ কার্ড তুলে দিতেই কেবল কার্ড বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৪৬ কোটি টাকা। কিন্তু এই বিপুল অঙ্কের কার্ড নির্মাণ খরচ, ব্যাংক হিসাব পরিচালনা ও ট্রান্সফার চার্জের দায়ভার কে বহন করবে—সরকার নাকি সুবিধাভোগী প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। সরকারের অর্থ বিভাগের দায়িত্বশীলদের মধ্য থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, ভাতা পৌঁছানোর প্রক্রিয়াতেই যদি শত শত কোটি টাকা খরচের বোঝা চেপে বসে, তবে মূল মানবিক সহায়তা কর্মসূচির উদ্দেশ্যই ভেস্তে যেতে পারে।
জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কার্ডপ্রতি ৬০০ টাকা খরচ ধরে ৪১ লাখ পরিবারের পেছনে বাজেটে নির্ধারিত ভাতার বাইরে অতিরিক্ত মোটা অঙ্কের প্রশাসনিক খরচের হিসাব সামনে এসেছে। আগামী চার বছরে ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে এই প্রকল্পের আওতায় আনলে কেবল প্লাস্টিক কার্ড বানাতেই খরচ ঠেকবে ৯৬০ কোটি টাকায়। এ উপলক্ষে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপস্থিতিতে অর্থ বিভাগ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা ব্যাংক হিসাব পরিচালনার বিশাল সার্ভিস চার্জ কে যোগাবে, সে বিষয়ে কোনো সমাধান মেলেনি।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন ইতোপূর্বে ফ্যামিলি কার্ড সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিতরণের ঘোষণা দিয়ে আর্থিক লেনদেনকে প্রতারণা হিসেবে হুঁশিয়ার করলেও আমলাতান্ত্রিক টেবিলে খরচের দায় কার—তা ঝুলন্তই রয়ে গেছে। অন্যদিকে অর্থ বিভাগ স্পষ্ট করেছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর এই কার্ড নির্মাণের বাড়তি চার্জ চাপানো হবে নাকি রাষ্ট্রীয় কোশাগার থেকে এই চাপ সামলানো হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যস্বত্বভোগী কমানোর অজুহাতে ডিজিটাল ও টাকাপে আন্তঃসংযোগ ব্যবহারের নামে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোর অতিরিক্ত চার্জ যুক্ত হয়ে বাজেট উপচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ভাতার আড়াই হাজার টাকা পাওয়ার আগেই যদি ফি ও কার্ডের নামে খরচ বাড়ে, তবে এটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য সহায়ক হওয়ার বদলে এক বড় প্রশাসনিক অপচয়ের খাত হিসেবে দেখা দেবে।


