জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার চরম বিপর্যয় এবং বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে আকস্মিক কারিগরি ত্রুটির জেরে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ধস নেমেছে। তীব্র গরমে দেশের ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এর ফলে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার দেশের মোট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬২টির উৎপাদনই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর মধ্যে সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল ২০টি কেন্দ্র। বাকিগুলো নামমাত্র সক্ষমতায় চালিত হয়। ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে জোগান কমে যাওয়ায় ওই দিন দিনের বেলাতেই রেকর্ড ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
গত এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা তীব্র গ্যাস সংকটের সঙ্গে কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ওপর পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী এবং আদানির ঝাড়খণ্ড কেন্দ্রসহ বড় বড় বেশ কিছু কেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়া বা বন্ধ থাকায় সংকট চরম রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে আদানির প্ল্যান্ট থেকে সক্ষমতার পুরো বিদ্যুৎ মিলছে না।
রাজধানীর অবস্থা এখন করুণ। গত ১২ আগস্ট থেকে সরকারি নির্দেশনায় ঢাকায় নিয়মিত লোডশেডিং শুরু হলেও তা শিডিউল অনুযায়ী মানা হচ্ছে না। বসুন্ধরা ও যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দারা জানান, দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ উধাও হওয়ার পাশাপাশি গ্যাসের তীব্র সংকটও দেখা দিচ্ছে। ডিপিডিসি ও ডেসকো প্রতিদিন সুনির্দিষ্ট সময়ে সীমিত লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিদ্যুৎ ও গ্যাস একসঙ্গে না থাকায় নগরবাসীকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে সিলিন্ডার গ্যাস ও বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ঢাকার বাইরে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮০টি সমিতির আওতাধীন গ্রামাঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ঘাটতির বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে প্রান্তিক জনপদকে, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে পুরো এলাকা। তেলচালিত কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি থাকলেও বকেয়া বিল পরিশোধের জটিলতা ও জ্বালানি সংকটের কারণে ২৪টি কেন্দ্রে তেল সরবরাহে টানাপোড়েন দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি আমদানিতে অব্যবস্থাপনা এবং পুরোনো ত্রুটিপূর্ণ অবকাঠামোর কারণে জ্বালানি সংকট স্থায়ী রূপ নিয়েছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এবং লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা বন্ধ না করলে এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো পথ নেই। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না হলে শিল্পোৎপাদন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জনজীবন পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


