লোহিত সাগরে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন সচল রাখতে বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশ নিয়ে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে সৌদি আরব। লোহিত সাগর, বাব আল–মানদেব প্রণালি ও এডেন উপসাগরীয় এলাকায় নৌযানের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাই এই নতুন জোটের মূল লক্ষ্য।
গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জোটটি গঠনের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জোটে ঢাকার অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সৌদি আরবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আরব নিউজ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোট সংক্রান্ত এই আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য ৫১টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে ৪৩টি দেশ সাড়া দিয়ে আলোচনায় অংশ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবসহ ১৪টি দেশের সমন্বয়ে প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্মটি বাস্তবায়িত হয়।
সৌদি আরব ও বাংলাদেশ ব্যতীত জোটের অন্য সদস্যদেশগুলো হলো— তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও নাইজেরিয়া।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, জোট গঠন নিয়ে রিয়াদে অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান প্রতিনিধিত্ব করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিগত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এই জোটে যুক্ত হওয়া নিয়ে রিয়াদের সঙ্গে ঢাকার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলছিল। সকল দিক পর্যালোচনা করেই বাংলাদেশ এতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
কেন এই জোট
আল–জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্ব বাণিজ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল নৌপথ হিসেবে পরিচিত বাব আল–মানদেব প্রণালি। এই পথেই বিশ্ব বাণিজ্যের ১০ থেকে ১২ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ‘হরমুজ প্রণালি’ অকার্যকর হয়ে পড়ায় সৌদি আরব তাদের তেল রপ্তানির বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরকে ব্যবহার করছিল। পূর্বাঞ্চলের তেল শোধনাগার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ইয়ানবু বন্দরে তেল এনে তা বাজারজাত করা হচ্ছিল।
তবে ইয়েমেনের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিরা লোহিত সাগর উপকূলে সৌদি জাহাজের ওপর অবরোধ ও হামলার হুমকি দেওয়ায় নতুন করে বিপত্তি তৈরি হয়। ওই অঞ্চলে তেলবাহী জাহাজে হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার পটভূমিতেই রিয়াদ মূলত নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক পথ সচল রাখতে এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
জোটের কার্যপরিধি ও লক্ষ্য
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ভারত মহাসাগর থেকে শুরু করে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা রক্ষা এবং কৌশলগত প্রণালিগুলোতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখাই জোটের প্রধান কাজ।
নিরাপত্তা হুমাক মোকাবিলায় সদস্যদেশগুলোর মধ্যে তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান, সমন্বিত সামরিক মহড়া এবং যৌথ অভিযানের পরিকল্পনা করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে এই জোটে কোন দেশ কেমন নৌ বা বিমানশক্তি সরবরাহ করবে, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। জোটটিকে সম্পূর্ণ ‘প্রতিরক্ষামূলক’ দাবি করে বলা হয়েছে, এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশকে নিশানা করে গঠিত হয়নি।
জোটে যোগদান নিয়ে বিশ্লেষকদের মতামত
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক উদ্যোগে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা নিয়ে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান জানান, বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবে কোনো প্রত্যক্ষ সামরিক বা প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হওয়ার নীতি অনুসরণ করে না। তাই এই অংশগ্রহণের সার্বিক দিক পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পুরো মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যেহেতু বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্ক ও বিপুলসংখ্যক শ্রমবাজারসহ অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে, তাই বাংলাদেশ যেন কোনো অবস্থাতেই সামরিক সংঘাতের মুখোমুখি অবস্থান না নেয় বা কোনো পক্ষের মুখোমুখি না দাঁড়ায়— সে বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।”
উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী ইসলামী সামরিক জোট’ (আইএমসিটিসি)–এ বাংলাদেশ যোগ দিয়েছিল। তবে নীতিগত অবস্থানের কারণে রিয়াদে পূর্ণাঙ্গ সামরিক প্রতিনিধি দল পাঠায়নি ঢাকা।


