Homeআন্তর্জাতিকআরাকান আর্মির ফাঁদে পাহাড়ি তরুণ

দুই বছরে ওপারে চার শতাধিক, সক্রিয় ২০ রুট
আরাকান আর্মির ফাঁদে পাহাড়ি তরুণ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র তীব্র জনবল সংকট মেটাতে টার্গেট করা হচ্ছে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ ও যুবকদের। উন্নত জীবন, মোটা অঙ্কের বেতন ও নতুন স্বাধীন ভূখণ্ডে লোভনীয় সরকারি চাকরির মিথ্যা আশ্বাসে দুর্গম পাহাড়ের তরুণদের ফাঁদে ফেলছে একটি শক্তিশালী পাচারকারী সিন্ডিকেট। গত দুই বছরে অন্তত চার শতাধিক পাহাড়ি যুবক সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে গিয়ে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাঙামাটি, বান্দরবান এবং চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশের বেকার ও সহজ-সরল তরুণদের টার্গেট করে পাহাড়ে বেশ কিছু এজেন্ট নিয়োগ দিয়েছে আরাকান আর্মি। স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ওপারে পাঠানোর সময় এককালীন ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বেতনের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। সীমান্ত পার করার পর রাখাইনের ক্যাম্পে তাঁদের স্বল্পমেয়াদি অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি যুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরিবারগুলোকে নিয়মিত ভাতা দেওয়া এবং ওপারে থাকা তরুণদের সঙ্গে ফোনে কথা বলার ব্যবস্থাও করে দিচ্ছে এই এজেন্টরাই।

সীমান্তের ২০ রুট সক্রিয়

বর্তমানে রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টিই আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ২২১ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্তে জান্তা বাহিনীর কোনো উপস্থিতি নেই। সংগঠনটির প্রধান তোয়ান ম্রাত নাইং ২০২৭ সালের মধ্যে রাখাইনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লক্ষ্যে এই নিয়োগ বাণিজ্য চালাচ্ছেন।

সীমান্ত পারাপারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ির অন্তত ২০টি পয়েন্ট। এর মধ্যে টেকনাফের চাকমারকুলের কোয়ানচিবন, হোয়াইক্যংয়ের ডেউবুনিয়া, কাঞ্জরপাড়ার শালখালী, জাদীমুড়ার রংগাদন এবং উখিয়ার ভালুখিয়ার শিকদারপাড়া, পালংখালীর লাম্মনহালী ও নাইক্ষ্যংছড়ির ফুলতলী, চাকঢালা অন্যতম। নাইক্ষ্যংছড়ির স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, কেবল এই একটি উপজেলা থেকেই গত দুই বছরে কয়েক শ যুবক অবৈধভাবে রাখাইনে পাড়ি জমিয়েছেন।

বিজিবি ও র‌্যাবের অভিযানে চাঞ্চল্যকর তথ্য

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে আরাকান আর্মিতে বাংলাদেশি তরুণদের যোগ দেওয়ার একাধিক প্রমাণ মিলেছে। চলতি ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি নাইক্ষ্যংছড়ির ৩৪ নম্বর সীমান্ত এলাকা থেকে রাঙামাটি ও বান্দরবানের তিন মার্মা যুবককে মায়ানমার মুদ্রাসহ আটক করে বিজিবি। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্ত থেকে রাঙামাটির নয়ন চাকমাসহ দুজনকে আটক করা হয়। একই বছরের মার্চে কক্সবাজারের খুরুশকুল থেকে ৬০ জোড়া আরাকান আর্মির ইউনিফর্মসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১৫।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে যে, রাখাইনের মংডু এলাকার কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বরত নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারীর যুবক শুলু মার্মা ওরফে মংনু মার্মা যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। যদিও পরিবার বা প্রশাসন বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার জানান, প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদের ওপারে নিয়ে যাওয়ার তথ্য তাঁদের কাছে রয়েছে এবং অবৈধ পারাপার ঠেকাতে সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। কক্সবাজারের ৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম খায়রুল আলম জানান, আটক বাংলাদেশি যুবকরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, ভৌগোলিক, ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-আচরণ অভিন্ন হওয়ায় এবং অর্থনৈতিক হতাশা থাকার কারণে পাহাড়ি তরুণরা সহজে প্রলোভনে পড়ছে। এই অবৈধ অনুপ্রবেশ ও যোগদান ঠেকাতে সরকারের উচিত অবিলম্বে স্থানীয় উপজাতি নেতাদের সঙ্গে নিয়ে কার্যকর সামাজিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য