আওয়ামী লীগের পদধারী ও সক্রিয় নেতাকর্মীদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য করার প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। আসন্ন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তাবিত আচরণ বিধিমালায় এই বিধান যুক্ত করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) চিঠি দিয়েছে দলটি। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জামায়াতের এই সুপারিশ আমলে নেওয়া হলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কোনো স্তরেই প্রার্থী হতে পারবেন না।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আইনগতভাবেই দলটির নেতাকর্মীরা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন। ইসি এই আইন প্রয়োগ না করলে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় কমিশনকেই নিতে হবে। ইসি সূত্রে জানা গেছে, এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই বিধান যুক্ত করায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ওই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে হওয়ার কারণে আচরণ বিধিমালায় এই নিয়ম যুক্ত করার বিষয়ে ইসি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সেনা মোতায়েনের সুপারিশ
খসড়া আচরণ বিধিমালার ওপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংস্থার সুপারিশ জমা দেওয়ার সময় গত ৩০ জুন শেষ হয়েছে। প্রাপ্ত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ স্থানীয় সরকারের মেয়র ও চেয়ারম্যান পদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘স্নাতক’ এবং কাউন্সিলর ও সদস্যদের জন্য ‘এসএসসি’ বা সমমান নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি তারা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, ঋণখেলাপি ও অর্থ পাচারকারীদের অযোগ্য ঘোষণা এবং প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েনের সুপারিশ করেছে।
অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশির ভাগ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এই বিষয়ে কোনো সুপারিশ জমা দেয়নি।
মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা ও এনজিওর ভূমিকা বন্ধের দাবি
নির্বাচনি প্রচারে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের প্রভাব বন্ধের ওপর জোর দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও ইসলামিক ফ্রন্ট। দলগুলো প্রস্তাব করেছে, নির্বাচনের সময় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা যাতে নিজ নির্বাচনি এলাকায় অবস্থান করতে না পারেন, আচরণ বিধিমালায় সেই স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকতে হবে। এছাড়া নির্বাচনি প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত মহিলা সদস্যপদ বাতিল করে প্রতিটি ওয়ার্ডে সরাসরি নারী সদস্য নির্বাচনের প্রস্তাব করেছে জামায়াত।
এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক ও ইসির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জকরিয়া ভোটারদের প্রভাবিত করতে জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর সংগ্রহ এবং ধর্মীয় ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রচার চালানো বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে এনজিওর ভূমিকা নিষিদ্ধের প্রস্তাব করেছেন তিনি। নির্বাচনি ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, হলফনামার তথ্য যাচাই এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বেতারের অপব্যবহার বন্ধের সুপারিশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থান
আগামী অক্টোবর মাসে স্থানীয় সরকারের কয়েকটি স্তরে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে ইসি, যার তফসিল আগস্টের শেষে বা সেপ্টেম্বরে ঘোষণা হতে পারে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো সরাসরি সংলাপ হবে না বিধায় লিখিত মতামত নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই করছেন। আগামী মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা হওয়ার কথা রয়েছে। নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনের অযোগ্য করার দাবিসহ অন্যান্য নীতিগত বিষয়ে কমিশন সভাতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


