কিছুতেই দমানো যাচ্ছে না কিশোর গ্যাং কালচার। দিন যত যাচ্ছে, ততই ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে কিশোর অপরাধীরা। অলিগলিতে অস্ত্রের মহড়া, মাদক কারবার, চুরি-ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপকর্মে পুরো রাজধানীতে তারা এখন মূর্তিমান আতঙ্ক। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শক্তি প্রদর্শনে এখন বিদেশি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে অনেক গ্যাং। একই সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা হয়ে উঠেছে আরও বেপরোয়া।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে এখন ১৫৯টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যাদের মোট সদস্যসংখ্যা ৩ হাজারের বেশি। গত বছর এই গ্যাংয়ের সংখ্যা ছিল ১১৮টি। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। ডিএমপির তথ্যমতে, অপরাধের হটস্পট হিসেবে শীর্ষে রয়েছে তেজগাঁও বিভাগ (৪০টি) এবং দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মিরপুর বিভাগ (৩৫টি)। এ ছাড়া ওয়ারীতে ২০টি, মতিঝিলে ১৬টি, উত্তরায় ১৫টি, রমনায় ১২টি, গুলশানে ১১টি এবং লালবাগে ১০টি গ্যাং সক্রিয়।
থানাভিত্তিক অপরাধ চিত্রে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা মোহাম্মদপুরে। একা এই থানাতেই সক্রিয় রয়েছে ২৭টি দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা পল্লবী এলাকায় গ্যাংয়ের সংখ্যা ১৬টি। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ীতে ৮টি, খিলগাঁওয়ে ৭টি, হাজারীবাগ ও আদাবরে ৬টি করে এবং উত্তরের বিভিন্ন থানায়ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্যাংয়ের দাপট রয়েছে।
মোহাম্মদপুরে ২৭ গ্যাংয়ের রাজত্ব প্রকাশ্যে ছিনতাই, দখলদারিত্ব, মাদকের রমরমা কারবার আর অস্ত্রের মহড়ায় সবসময় তপ্ত থাকে মোহাম্মদপুর। এখানে সক্রিয় ২৭টি গ্যাংয়ের মধ্যে রয়েছে— পাটালী গ্রুপ, লেভেল হাই, আনোয়ার, ফরহাদ, আর্মি আলমগীর ও নবী গ্রুপ, ডাইল্লা, এলেক্স, আকবর, গাংচিল, ল ঠেলা, আশরাফ, স্টার বন্ড, ভাইব্বা ল কিং, চেতালেই ভেজাল, টক্কর ল, ঘুটা দে, লারা দে, মিরাজ, সুমন, মাহি, সাব্বির, পিচ্চি হেলাল, চার্লি ও বেলচা মনির গ্রুপ।
এসব গ্রুপের প্রায় ৪৮১ জন সদস্য এলাকাটিতে অপরাধের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জামিনে বেরিয়েই তারা পুনরায় বেপরোয়া হয়ে উঠছে। স্থানীয় থানা সূত্রে জানা গেছে, নিম্ন আয়ের ভাসমান মানুষের আধিক্য থাকায় সহজেই কিশোরদের এসব গ্যাংয়ে ভেড়ানো সম্ভব হচ্ছে।
পল্লবীতে ১৬ গ্যাং, পেছনে শীর্ষ সন্ত্রাসী ডিএমপির তালিকা অনুযায়ী, পল্লবীতে তাণ্ডব চালাচ্ছে আশিক গ্রুপ, রাজু, রকি, পিন্টু-কাল্লু, রোমান্টিক, মুসা হারুনের ভাই ভাই, মুরাদ, আরমান, জুম্মান, বাহাদুর, বাহবালী, ৬.৯ ইয়াসিন, সোহেল, আসাদ কাল্লু ও দীপ গ্রুপ। এর মধ্যে আশিক গ্রুপেই ২৫ জন সদস্যের তালিকা রয়েছে, যদিও বাস্তবে এ সংখ্যা শতাধিক। অভিযোগ রয়েছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘ফোর স্টার’ গ্রুপের মামুনসহ স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা নিজস্ব স্বার্থে এসব গ্রুপকে ব্যবহার করছে।
উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীতে অস্ত্রের দাপট ২০১৭ সালে আদনান কবির হত্যাকাণ্ডের পর উত্তরায় সাঁড়াশি অভিযান চালানো হলেও তা সাময়িক প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে সেখানে নতুন করে ১৫টি গ্রুপ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, রাজধানীর প্রবেশদ্বার যাত্রাবাড়ীতে পরিবহন চাঁদাবাজি ও মাদকের নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ৮টি গ্যাং। এর মধ্যে পলাশ, ফাহিম, লিটন, ওয়ালিদ, আহনাফ, জীবন, শুভ-জাহিদ ও সাকিব গ্রুপের অন্তত দেড় শতাধিক সদস্য চাপাতি, রামদা ও সামুরাই নিয়ে এলাকায় নিয়মিত সশস্ত্র মহড়া দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ ও পুলিশের বক্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, গ্যাং সংস্কৃতির পেছনের পৃষ্ঠপোষক বা ‘বড় ভাইদের’ আইনের আওতায় না আনায় এই সংকট কাটছে না। সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা ‘প্রিভেনশন পুলিশিং’ এবং সামাজিক মোটিভেশন শনাক্ত করার ওপর জোর দেন।
সার্বিক বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মোহাম্মদ ওসমান গণি জানান, কিশোর গ্যাং দমনে নিয়মিত ব্লক রেইড পরিচালনা করা হচ্ছে এবং অপরাধের সঙ্গে সঙ্গেই নেওয়া হচ্ছে কঠোর আইনি ব্যবস্থা। পাশাপাশি কিশোরদের অপরাধ থেকে ফিরিয়ে আনতে তাদের অভিভাবকদের নিয়েও কাউন্সিলিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।


