ভারতে পালানোর চেষ্টাকালে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের যৌথ দল। গতকাল বুধবার ভোর পৌনে ৪টার দিকে যশোর শহরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।সকাল ১০টার দিকে তাঁদের চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে পুলিশ গ্রেপ্তার চারজনকে নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়। এসব তথ্য জানিয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘আমরা সন্ত্রাসী ইমন, রায়হানসহ সবার যাবতীয় তথ্য ইমগ্রেশনকে জানিয়েছি। তাঁদের কেউ দেশ ছাড়তে পারবেন না।
ইমন তাঁর সহযোগীদের নিয়ে যশোর সীমান্ত ক্রস করার সময় আমাদের জালে ধরা পড়েন। ইমনের সঙ্গে আল ইসলাম, আলিফ তমাল, শামীম শাফায়ত নামের তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানানো হবে।’
পুলিশ ইমনকে গ্রেপ্তারের সময় ধারণ করা একটি ভিডিও সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ ইমনকে নাম জিজ্ঞাসা করলে তিনি নিজেকে মিরাজ বলে পরিচয় দেন। পেশায় পুরান ঢাকায় চাকরি করেন বলে জানান। বাড়ি প্রথমে ঢাকায় বলে জানান, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে বলেন তাঁর বাড়ি চট্টগ্রামে। যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. মিরাজুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রাম পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যশোর জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ ও কোতোয়ালি থানাসহ পুলিশের ৯টি দল যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে। যশোর-ঢাকা মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে ডেভিড ইমন ও তাঁর তিন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়।তিনি জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা জানান, তাঁরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশে যশোরে আসেন। এ বিষয়ে আরো তদন্ত চলছে।
ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। গ্রামের সাধারণ ঘরের সন্তান ইমন প্রথমে কারারুদ্ধ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেনের গ্রুপে যোগ দেন। ইমন বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর হয়ে কাজ করতেন। সাজ্জাদ হোসেন ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ গ্রেপ্তার হলে তাঁর গ্রুপের নেতৃত্ব ইমনের হাতে চলে আসে। বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড হয়ে ওঠেন ইমন। এরপর চট্টগ্রামে একের পর এক খুনে তাঁর নাম জড়ায়।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে বাকলিয়া ও চান্দগাঁওয়ে দুটি জোড়া খুন, যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী হত্যা, চাঁদাবাজিসহ দেড় ডজনের বেশি মামলা রয়েছে।
গত দেড় বছরে সাজ্জাদ-ইমন-রায়হানের গ্রুপের সদস্যদের কাছ থেকে অন্তত অর্ধকোটি টাকার বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ ও র্যাব। পুলিশ ও র্যাবের ধারণা, তাঁদের কাছে একে-৪৭সহ ভারী অস্ত্র রয়েছে। একাধিক ঘটনায় এই চক্র ভারী অস্ত্র প্রদর্শনও করেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন অত্যাধুনিক মডেলের অস্ত্রসহ ইমনের একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে তাঁরা স্যাটেলাইট ফোনসহ উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেন বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
পুলিশ জানায়, ১১ জুলাই হোয়াটসঅ্যাপে কল করে নিজেকে ‘ডেভিড ইমন’ পরিচয় দিয়ে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর কাছে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং পরে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওই ব্যক্তিকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। এই ঘটনার দুই দিন পর, ১৩ জুলাই দুপুরে ওই প্রতিষ্ঠানে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি সশস্ত্র দল হামলা চালায়। হামলাকারীরা অফিসের কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন, আসবাব, কাচের দরজাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর করে। এতে প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সময় দুর্বৃত্তরা অফিসের ড্রয়ারে থাকা ৪৭ হাজার টাকা, তিনটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, একটি ক্যানন প্রিন্টার এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আরিফুল ইসলামের কাঁধের ব্যাগটি নিয়ে যায়। ওই ব্যাগে কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য রাখা প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ছিল বলে ওই দিনই করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুই দফা সাবেক এমপি ও স্মার্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিআইপি মুজিবুর রহমানের বাসায় চাঁদার দাবিতে ব্রাশফায়ার করেন ইমন ও রায়হান। এ ছাড়া বায়েজিদ ও পাঁচলাইশের বিভিন্ন নির্মীয়মাণ বাড়ির কাজ বন্ধ করে দেন চাঁদা না পেয়ে। সর্বশেষ ১৯ জুলাই হাটহাজারীর বড়দিঘি এলাকায় একটি বাড়ির মালিকের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা চাওয়া হয়। মালিক থানায় মামলা করলে চাঁদার পরিমাণ ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা দাবি করে তাঁকে হত্যার হুমকি দেন তাঁরা। সন্ত্রাসী সাজ্জাদ, ডেভিড ইমন, রায়হানের গ্রুপের হয়ে ৪০ থেকে ৫০ জন চাঁদাবাজি করে বলে জানায় পুলিশ।
ডেভিড ইমন, রায়হান, সাজ্জাদ হোসেনদের (ছোট সাজ্জাদ) মতো সাজ্জাদ আলীর দলে ছিলেন ঢাকাইয়্যা আকবর, সরোয়ার বাবলা ও নুরনবী ম্যাক্সনের মতো সন্ত্রাসীরা। ম্যাক্সন ভারতে স্ত্রীর হাতে মারা যান, ঢাকাইয়া আকরবকে হানিট্র্যাপে ফেলে পতেঙ্গা সৈকতে নিয়ে গুলি করে এবং সরোয়ার বাবলাকে একটি রাজনৈতিক গণসংযোগের মধ্যেই গুলি করে হত্যা করানোর অভিযোগ রয়েছে সাজ্জাদ আলীর বিরুদ্ধে। ডেভিড ইমন পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও রায়হান এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সাজ্জাদ আলীর অনুসারী ইমন-রায়হানের চাঁদাবাজির শিকার এক ব্যবসায়ী বলেন, ইমন গ্রেপ্তারে স্বস্তি এলেও রায়হান গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আতঙ্ক থাকবে। আমরা চাই, সব অপরাধী গ্রেপ্তার হয়ে আইনের আওতায় আসুক। তবে পুলিশ বলছে, রায়হানও শিগগিরই আইনের আওতায় আসবেন।


