দেশে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রকট আকার ধারণ করিবার আশঙ্কার মধ্যেই স্তব্ধ হইয়া পড়িয়াছে নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করিবার অতি গুরুত্বপূর্ণ এক সরকারি প্রকল্প। প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়া, সময়মতো ব্যাংক হিসাব না খোলা, অর্থ ছাড়ে চরম ধীরগতি এবং ১৬০টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করিতে না পারার মতো প্রশাসনিক অচলাবস্থায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করিয়াছে বিশ্বব্যাংক। পরিস্থিতির সুরাহা না হওয়ায় উক্ত প্রকল্প হইতে আড়াই কোটি (২৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার অর্থায়ন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি।
বিশ্বব্যাংক সতর্ক করিয়া দিয়াছে, অবিলম্বে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও নীতিগত সংস্কার না করিলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা চরম ঝুঁকিতে পড়িবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের ২৭ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হইয়াছেন ১৩ হাজার ৬৪৪ জন এবং প্রাণ হারাইয়াছেন ৪৪ জন। কেবল জুলাই মাসের প্রথম ২৭ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যা ৭ হাজার ৫৪০ জন, যাহা জুনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। বিশেষ করিয়া ডেঙ্গুতে নারী মৃত্যুর হার (৫৯.১ শতাংশ) আশঙ্কাজনক রূপ লইয়াছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন কর্তন ও প্রশাসনিক লাল ফিতা
বিশ্বব্যাংকের বাস্তবায়ন মূল্যায়নে প্রকাশ পাইয়াছে, প্রকল্প শুরুর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হইলেও মৌলিক প্রশাসনিক প্রস্তুতিই সম্পন্ন হয় নাই। দীর্ঘদিন যাবৎ প্রকল্পটি পরিচালকশূন্য হইয়া রহিয়াছে। থমকে আছে ক্রয় কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ। সময়মতো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না খোলায় উন্নয়ন সহযোগীর অর্থ থাকা সত্ত্বেও উহা ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি করিতে পারে নাই দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তর। প্রকল্পে এ পর্যন্ত বরাদ্দকৃত অর্থের মাত্র ০.৫ শতাংশ ছাড় হইয়াছে, যাহা সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনার চরম দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ।
বিশেষত, নির্মিত ১৬০টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র হস্তান্তর সত্ত্বেও চালু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হইয়াছে প্রতিবেদনে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি চালু থাকিলে তৃণমূল পর্যায়ে ডেঙ্গু রোগী দ্রুত শনাক্ত ও প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হইত, যাহা বড় হাসপাতালগুলির ওপর চাপের বোঝা অনেকটাই কমাইত।
বিশেষজ্ঞদের গভীর উদ্বেগ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, “আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো ভীষণভাবে হাসপাতালকেন্দ্রিক। আইসিইউ বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হইলেও তৃণমূল পর্যায়ে রোগী প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করার উদ্যোগ দুর্বল। সংকট গুরুতর হইবার পর রোগী হাসপাতালে আসিলে চিকিৎসকদের হস্তক্ষেপেও কাজ হয় না। ফলে মৃত্যুর হার বাড়িতেছে।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন সতর্ক করিয়া বলেন, বৃষ্টি ও রোদের বর্তমান আবহাওয়া এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল। ফলে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করিতে পারে এবং উহা নভেম্বর পর্যন্ত গড়াইতে পারে। মশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের চিরাচরিত কার্যক্রমের সমালোচনা করিয়া তিনি জনগণকে সম্পৃক্ত করিয়া ধারাবাহিক পরিচ্ছন্নতা অভিযানের তাগিদ দেন।
একদিকে দেশের চট্টগ্রাম ও বরিশালসহ বিভিন্ন বিভাগে ডেঙ্গু মহামারি আকারে ছড়াইয়া পড়িতেছে, অন্যদিকে প্রশাসনিক জটিলতায় জনস্বাস্থ্যের জন্য নির্ধারিত বিশ্বব্যাংকের অর্থ ফেরত যাইতেছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অনতিবিলম্বে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, ব্যাংক হিসাব সচল এবং ১৬০টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালুর মাধ্যমে গতি ফেরাইবার জোর দাবি জানাইয়াছেন বিশেষজ্ঞরা।


