Homeজাতীয়কাজ শুরুর আগেই ঠিকাদারের পকেটে ২১৭ কোটি!

কাজ শুরুর আগেই ঠিকাদারের পকেটে ২১৭ কোটি!

কাজ শুরুর কোনো লক্ষণ নেই, অথচ চুক্তির অজুহাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পকেটে চলে গেছে সরকারের বিপুল অঙ্কের অগ্রিম অর্থ। ১ হাজার ১১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য রেডিও ডিভাইস উৎপাদন কারখানা স্থাপন প্রকল্পের কাজ শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছে ২১৭ কোটি টাকারও বেশি। বিপুল অঙ্কের এই বাজেটে কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা হলেও উৎপাদিত একেকটি রেডিও ডিভাইসের আসল দাম কত পড়বে—তার কোনো হিসাবই নেই প্রকল্প প্রস্তাবে!

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত অস্পষ্ট ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’র (এনডিএ) আওতায় বিতর্কিত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মূল কাজ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘এল থ্রি হ্যারিস’ (L3Harris)। দেশে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে ‘অঙ্গীকার ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থা। দৈনন্দিন সরকারি কেনাকাটা ও টেন্ডার প্রক্রিয়ার নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে তড়িঘড়ি করে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাঠানোর ঘটনায় প্রশাসনিক ও বিশেষজ্ঞ মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

টেবিলের দাম ৬ কোটি, টিওটি চুক্তিতে মিলবে না কোনো সোর্স কোড

প্রকল্পের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকার একটি অত্যন্ত সংরক্ষিত এলাকায় ৩,৮২৪ বর্গফুট জায়গার ওপর এ কারখানা ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ সরঞ্জাম প্রকল্প রূপায়নের পরিকল্পনা হয়েছে। তবে আসল উৎপাদনের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৮১০ বর্গফুট।

কারখানাটিতে রেডিও ডিভাইস তৈরির কাজ সম্পাদনে আটটি ‘বিশেষ’ টেবিল বসানো হবে, যার প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা! অর্থাৎ শুধু আটটি টেবিল কিনতেই ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা। একইভাবে মাত্র একটি ‘নেটওয়ার্ক র‍্যাক সিস্টেম’-এর দামও ধরা হয়েছে প্রায় ৬ কোটি টাকা। ছয় বছর মেয়াদি এই বিশাল প্রকল্পে জনবল লাগবে মাত্র সাতজন, অথচ বিদেশে তিন কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচ করে প্রশিক্ষণে পাঠানো হবে আটজনকে!

প্রকল্পের অন্যতম বড় জালিয়াতি উন্মোচিত হয়েছে ‘প্রযুক্তি স্থানান্তর’ (টেকনোলজি ট্রান্সফার বা টিওটি) প্রক্রিয়ায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিওটি চুক্তিতে সাধারণত পণ্যের নকশা, সোর্স কোড, কাঠামোগত স্থাপত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ হস্তান্তরের স্পষ্ট বিধান থাকে। অথচ এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশকে মূল সোর্স কোড বা মূল প্রযুক্তি দেওয়া হবে না। বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ এনে এখানে কেবল ‘স্ক্রু ড্রাইভার প্রযুক্তিতে’ জোড়া দেওয়া (অ্যাসেম্বল) হবে।

প্রকল্প পর্যালোচনা করে বিশেষজ্ঞ দলটি জানিয়েছে, চুক্তির ১২টি মূল শর্তের মধ্যে সাতটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাকি পাঁচটি মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ। পুরো প্রক্রিয়ায় দেশের লাভের কোনো সুযোগ নেই; বরং এলসির আড়ালে কোটি কোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক টেন্ডার বিধিমালা লঙ্ঘন

নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ভিএইচএফ ও এইচএফ সিরিজের চার হাজার রেডিও ডিভাইস অ্যাসেম্বলিংয়ের জন্য দরপত্র প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক দরপত্রের নিয়ম অনুযায়ী সর্বনিম্ন ৪৮ দিন সময় দেওয়ার বিধান থাকলেও মাত্র ২৮ দিনের (৪ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ) মধ্যে ঈদের বন্ধের সুযোগ নিয়ে পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করা হয়। কাজ দেওয়া হয় এল থ্রি হ্যারিসের স্থানীয় প্রতিনিধি অঙ্গীকার ইন্টারন্যাশনালকে।

চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরই অত্যন্ত দ্রুততায় গত ২৩ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের এলসি শাখা থেকে নিউ ইয়র্ক সিটি ব্যাংকে রাখা এল থ্রি হ্যারিসের নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে প্রথম কিস্তির ২১৭ কোটি ২৮ লাখ৭৬ হাজার ২৯৭ টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাকী টাকা ২০৩২ সালের মধ্যে আরও ছয়টি কিস্তিতে পরিশোধ করার কথা রয়েছে।

নজিরবিহীন অনিয়ম: টিআইবি

সরকারি কোনো প্রকল্পে কাজ করার আগেই ঠিকাদারকে এভাবে কোটি কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়ার ঘটনাকে নজিরবিহীন বলে আখ্যা দিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, “সরকারি প্রকল্পে ঠিকাদারকে কাজ শুরুর আগে এভাবে অগ্রিম অর্থ পরিশোধের কোনো নজির নেই—চাই সেটা দেশীয় হোক বা আন্তর্জাতিক। চুক্তিতে অগ্রিম দেওয়ার কথা লেখা থাকলেও তা সম্পূর্ণ প্রশ্নবিদ্ধ ও অনৈতিক। সাধারণত ঠিকাদার ব্যর্থ হলে জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত করার বিধান থাকে, আর এখানে ঘটেছে তার উল্টো। জনগণের এই বিপুল অর্থ এভাবে ছেড়ে দেওয়ার পেছনে বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির আলামত স্পষ্ট। বিষয়টি অবিলমে্ব তদন্ত হওয়া উচিত।”

ঠিকাদারের অসংলগ্ন বক্তব্য

অঙ্গীকার ইন্টারন্যাশর সালের সিইও মনজুর হোসেন জিম্মুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কথা বলতে চাননি। তবে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন মুরাদ মোবাইল ফোনে দাবি করেন, “কাজটি শতভাগ নিয়ম মেনে এগোচ্ছে। এটা কোনো নিম্নমানের চাইনিজ মালামাল নয়, বিশ্বের এক নম্বর কোম্পানি হ্যারিস থেকে কেনা হচ্ছে।”

কাজ শুরুর আগেই ২১৭ কোটি টাকা পাচার ও একটি টেবিলের দাম ৬ কোটি টাকা হওয়া সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি পুরো প্রজেক্ট প্রোফাইল পড়িনি, সব বলা সম্ভব নয়। মালামাল বুঝে নেওয়া সরকারি টিমের কাজ, তারা ১০০ ভাগ বুঝে টাকা দেবে।”

বিশ্ববাজারে ফ্রান্স, জার্মানি বা ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলো থেকে অনেক কম খরচে একই প্রযুক্তি আনা সম্ভব হলেও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির ওপর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও আর্থিক নির্ভরতা তৈরি করতেই এই আত্মঘাতী প্রকল্প চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মত।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য