Homeজাতীয়১১ সরকারি সংস্থার শীর্ষ পদে বিএনপির ১১ নেতা

নজিরবিহীন রাজনৈতিক নিয়োগ
১১ সরকারি সংস্থার শীর্ষ পদে বিএনপির ১১ নেতা

দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় ১২ জন নেতা। গত বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।

স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে আংশিকভাবে রাজনৈতিক নিয়োগ দেখা গেলেও, আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে একই সাথে সরকারি ১১টি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের বসানোর এমন ঘটনাকে নজিরবিহীন হিসেবে দেখছেন প্রশাসন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নিয়োগপ্রাপ্ত নেতাদের মধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদটি ছাড়া বাকি ১১টি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রাক্কলিত গ্রেড-২ পদমর্যাদায়। শর্তানুযায়ী, অন্য যেকোনো ব্যবসা, পেশা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গ ত্যাগ করে যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য তাঁদের এই চুক্তিভিত্তিক পদায়ন কার্যকর হবে।

কোন ১১ প্রতিষ্ঠানে কে কোন দায়িত্বে

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পেয়েছেন সামসুল আলম। অন্য ১১টি স্বশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পাওয়া বাকি ১১ জন রাজনৈতিক নেতা হলেন-

  • বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন: চেয়ারম্যান করা হয়েছে বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক ও রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে।
  • বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি): চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়েছে দলের সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এটিএম আবদুল বারী ড্যানীকে।
  • বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট (বিসিসিটি): ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগ পেয়েছেন দলের সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম (টিপু)।
  • বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড: চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাকির হোসেন (সিদ্দিকী)।
  • বাংলাদেশ জুট করপোরেশন: চেয়ারম্যান পদে এসেছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসান।
  • বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন: মহাপরিচালক করা হয়েছে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি সালাহ্উদ্দিন সরকারকে।
  • বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল): ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হক।
  • জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ: নির্বাহী সচিব পদে বসানো হয়েছে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মো. কামরুজ্জামান (কামরুজ্জামান দুলাল)।
  • বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি): চেয়ারম্যান করা হয়েছে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেককে।
  • বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি): চেয়ারম্যান করা হয়েছে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামানকে (সুরুজ)।
  • বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক): চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক বেনজীর আহমেদ।

উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার চলতি বছরের এপ্রিলে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রাথমিক অবস্থায় এসব রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় বিসিএস ক্যাডার বা পেশাদার জ্যেষ্ঠ আমলাদেরই স্থলাভিষিক্ত করেছিল।

কেন এই আকস্মিক পদ পরিবর্তন

রাজনীতি ও প্রশাসন খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, আমলাদের বদলে অভিজ্ঞতাহীন দলীয় নেতাদের এসব প্রশাসনিক পদে আনার পেছনে প্রধানত তিনটি বিষয় কাজ করেছে-

১. রাজনৈতিক পুনর্বাসন: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ আন্দোলনে সক্রিয় থেকেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক কৌশল বা আসন সমঝোতার কারণে যারা অংশ নিতে পারেননি, রাষ্ট্রীয় পদে পদায়নের মাধ্যমে তাঁদের মূল্যায়ন করা হলো।

২. প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের ওপর অবিশ্বাস: বর্তমান সরকার সংবেদনশীল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোতে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত আমলাদের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না।

৩. স্থবিরতা কাটানোর তাগিদ: আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে রুগ্ণ সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছিল না বলে বিএনপি নেতাদের দাবি।

জবাবদিহির সংকট ও আইনি বাধ্যবাধকতা

আইনগতভাবে বিসিক, তাঁত বোর্ড কিংবা ক্লাইমেট ট্রাস্টের মতো সংস্থায় যোগ্য যেকোনো ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান বা প্রধান হিসেবে নিয়োগের অবারিত একচ্ছত্র ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলছেন জবাবদিহির প্রক্রিয়া নিয়ে। বিসিএস আমলাদের ক্ষেত্রে দুর্নীতি বা অনিয়মে বিভাগীয় ব্যবস্থা কিংবা পেনশন বাতিলের সুনির্দিষ্ট আইন থাকলেও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের চুক্তিভিত্তিক পদে কীভাবে প্রশাসনিক শৃঙ্খলায় আনা হবে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।

অন্যদিকে বিসিকের নতুন চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ ও বিসিসিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী রওনাকুল ইসলাম জানিয়েছেন, স্থবির হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে গতিশীল করাই তাঁদের মূল চ্যালেঞ্জ এবং আমলাতান্ত্রিক সাহসের ঘাটতি কাটাতে রাজনীতিকদের ওপর ভরসা করাটা সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ।

প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, খাতভিত্তিক কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া শুধু রাজনৈতিক পদমর্যাদার ভিত্তিতে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে স্বজনপ্রীতি, সরকারি অর্থ অপচয় এবং দলীয় প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতিকেই পুনরায় উসকে দিতে পারে।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য