Homeঅর্থনীতিগ্যাসে স্থবির শিল্প খাত ও লোডশেডিং বাড়ার শঙ্কা

এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকের নিচে
গ্যাসে স্থবির শিল্প খাত ও লোডশেডিং বাড়ার শঙ্কা

কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তৈরি হওয়া তীব্র গ্যাস-সংকট ও লোডশেডিং পরিস্থিতি চলতি সপ্তাহে কমার কোনো লক্ষণ নেই। আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসায় চরম বিপাকে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহক, শিল্পকারখানার মালিক ও সিএনজি চালকেরা। সরবরাহ স্বাভাবিক হতে অন্তত আরও দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে নিশ্চিত করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

গত মঙ্গলবার মহেশখালীতে মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর থেকে সেটি থেকে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। টার্মিনালটির সম্পূর্ণ রূপান্তর প্রক্রিয়া চালু করতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে এক্সিলারেট এনার্জি। তবে কারিগরি কাজ শেষ করে অক্ষত থাকা দ্বিতীয় বয়লারটি আগামী সপ্তাহের মধ্যে চালু করা সম্ভব হলে দিনে অন্তত ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো যেতে পারে বলে আশা করছে পেট্রোবাংলা।

এক নজরে গ্যাস সংকটের চিত্র:

  • স্বাভাবিক এলএনজি সরবরাহ: দিনে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট।
  • বর্তমান এলএনজি সরবরাহ: ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে।
  • মোট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ: দিনে ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে মোট সরবরাহ নেমে এসেছে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে।

ধুঁকছে উৎপাদনমুখী শিল্প, বন্ধ হওয়ার উপক্রম কারখানার

গ্যাসের চাপ ৩ থেকে ৪ পিএসআই (PSI) থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে অধিকাংশ এলাকায় চাপ নেমে এসেছে শূন্য থেকে ২ পিএসআইয়ে। ঢাকা, গাজীপুর ও নরসিংদীর টেক্সটাইল এবং পোশাকশিল্প কারখানায় চরম স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

গাজীপুরের প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানায় কাঙ্ক্ষিত গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের তথ্যমতে, ওই অঞ্চলে শিল্প উৎপাদন ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এতে একদিকে বিদেশিদের হাতে সময়মতো রপ্তানি পণ্য পৌঁছানো নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন কারখানা মালিকরা। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) নেতারা দ্রুত পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট সরকারি বার্তা দাবি করেছেন যাতে শিল্পে সাময়িক ছুটি ঘোষণা করা যায়।

লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, গ্যাস না পাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১,৫০০ মেগাওয়াট কমে গেছে। ফলে ঢাকাসহ সারা দেশে ১,২০০ থেকে ১,৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানো হলেও গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

রাজধানী ও আশপাশের এলাকার গ্যাস বিতরণ সংস্থা তিতাস গ্যাস জানিয়েছে, সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আওতাধীন সব এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করবে। মোহাম্মদপুর, শেখেেরটেকসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় টানা গ্যাস না থাকায় রান্নার জন্য বিকল্প হিসেবে ইলিকট্রিক বা লাকড়ির চুলা ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহনের দীর্ঘ সারি জমে রয়েছে।

জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের মত

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, এক্সিলারেটের অগ্নিকাণ্ডজনিত জটিলতা নিরসনে কাজ করছে বিশেষজ্ঞ দল। আগামী সপ্তাহে কিছু সরবরাহ বাড়তে পারে। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জোর দিচ্ছে বর্তমান সরকার।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাবেক সদস্য মকবুল ইলাহী চৌধুরী মনে করেন, বছরের পর বছর দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলা ও আমদানিনির্ভর নীতির খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো দেশকে। সামুদ্রিক ঝোড়ো হাওয়া বা দুর্ঘটনায় টার্মিনাল বিকল হওয়া নতুন নয়। দীর্ঘমেয়াদি সংকট নিরসনে দ্রুত অভ্যন্তরীণ গ্যাসকূপ খনন ও বয়স্ক কূপ সংস্কারের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য