Homeআন্তর্জাতিকঘন ঘন লোডশেডিংয়ে পথে বসছে দেশের ফ্রিল্যান্সাররা

বাজাার হারাচ্ছে ফ্রিল্যান্সাররা
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে পথে বসছে দেশের ফ্রিল্যান্সাররা

দেশজুড়ে বিদ্যুতের চরম বিশৃঙ্খলা ও লাগামহীন লোডশেডিংয়ের নির্মম বলি হতে বসেছে দেশের উদীয়মান ফ্রিল্যান্সিং খাত। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও উচ্চগতির ইন্টারনেটের অভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে একের পর এক চুক্তি বাতিল হচ্ছে, হাতছাড়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং বাজারে ভারতের পরপরই বাংলাদেশের অবস্থান হলেও অবকাঠামোগত ভয়াবহ দেউলিয়াত্ব এখন পুরো খাতটিকে আক্ষরিক অর্থেই খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ থেকে ১০ লাখ সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহের বিদ্যুৎ-বিপর্যয় তাঁদের তিল তিল করে গড়ে তোলা বৈশ্বিক কেরিয়ারকে এক রাতে ধুলিসাৎ করে দিচ্ছে।

এক সেকেন্ডের বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে হাতছাড়া কোটি টাকার প্রজেক্ট

আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বাজারে যেখানে প্রতি মুহূর্তের উপস্থিতির ওপর লাইভ কাজ এবং বড় অঙ্কের চুক্তি নির্ভর করে, সেখানে ঘন ঘন লোডশেডিং দেশের তরুণদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুষ্টিয়ার সাইফুর রহমান আন্তর্জাতিক মাধ্যমের একজন ‘টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার’। ডিজিটাল মার্কেটিং, গুগল অ্যাডস ও এসইও নিয়ে কাজের পাশাপাশি নিজের একটি এজেন্সির মাধ্যমে তিনি বহু তরুণের কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন।

বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে তিনি জানান, কাজের মধ্যে বা আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টের সঙ্গে অত্যন্ত স্পর্শকাতর মিটিং চলাকালে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে আইপিএস ব্যাকআপ থাকলেও ডেস্কটপ সচল হতে যে সময়টুকু লাগে, তাতেই পুরো লাইভ সেশন কেটে যায়। এতে বিদেশি বায়ারদের কাছে পুরো এজেন্সির পেশাগত ভাবমূর্তি রাতারাতি নষ্ট হচ্ছে।

একই জেলার ওয়েব অ্যানালিটিকস ও গুগল অ্যাডস বিশেষজ্ঞ বাপ্পি হোসেনের অভিজ্ঞতাও চরম তিক্ত। লোডশেডিংয়ের কারণে নির্ধারিত সভা মিস হওয়া এবং কাজের ডেডলাইন ব্যর্থ হওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। তিনি বলেন, “বিদেশি ক্রেতাদের এই বিদ্যুৎ-সংকটের কথা বললে তারা দেশের সামগ্রিক অবকাঠামো নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলছে। মুক্ত পেশায় সার্বক্ষণিক সংযোগ থাকা বাধ্যতামূলক। বারবার এমন ঘটলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা শুধু চুক্তি বাতিলই করছে না, আমাদের ব্ল্যাকলিস্টে ফেলে দিচ্ছে।”

ডিভাইসের ক্ষতি ও সরাসরি আর্থিক মাশুল

বিদ্যুতের এই ভৌতিক আসা-যাওয়ায় শুধু প্রজেক্টই হাতছাড়া হচ্ছে না, বরং অনবরত ভোল্টেজ ওঠানামা করায় পুড়ছে লাখ টাকা দামের পিসি, মনিটর ও আধুনিক আইটি সরঞ্জাম। পাবনার গুগল অ্যাডস ও লোকাল এসইও বিশেষজ্ঞ স্মৃতি খাতুন জানান, বিদ্যুৎ-সংকটের প্রভাবে তরুণদের সরাসরি কাজ হারাতে হচ্ছে।

সম্প্রতি গভীর রাত তিনটায় নির্ধারিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্লায়েন্ট মিটিং বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে মিস করেন তিনি। ফলে হাতছাড়া হয়ে যায় একটি বড় অঙ্কের আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট। এর ওপর বারবার ওয়াইফাই বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং দামি ইলেকট্রনিক ডিভাইস নষ্ট হয়ে যাওয়ায় একেকজন ফ্রিল্যান্সার দ্বিমুখী আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম অপমান: ফাইভআরের রেড অ্যালার্ট

পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়ানক ও আশঙ্কাজনক রূপ দেখা গেছে বৈশ্বিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলোতে। বিশ্ব বিখ্যাত প্ল্যাটফর্ম ‘ফাইভার’ (Fiverr) এখন সরাসরি বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের প্রোফাইলে একটি অফিশিয়াল ওয়ার্নিং বা সতর্কবার্তা ঝুলিয়ে দিয়েছে। তারা বিশ্বজুড়ে ক্লায়েন্টদের প্রকাশ্যে জানিয়ে দিচ্ছে—‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে কাজ সরবরাহে বিলম্ব হতে পারে।’

টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার এবং ‘টিম ম্যাভিন’-এর প্রতিষ্ঠাতা কাজী মামুন বলেন, “গ্লোবাল বায়ারদের সামনে আমাদের প্রোফাইলে এমন নোটিশ ঝোলানো মানে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের জন্য এক চরম নেতিবাচক ও লজ্জাজনক বিজ্ঞাপন। এর চেয়ে বড় অশনিসংকেত আর হতে পারে না।”

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার ফজলে এলাহীও একই শঙ্কা প্রকাশ করে জানান, এই পরিস্থিতিতে নতুন কোনো কাজ তো মিলছেই না, উল্টো বহু কষ্ট করে ধরে রাখা পুরোনো বায়ারদের রিটেইন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অবকাঠামো রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থার দাবি

রাত জেগে কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি রেমিট্যান্স যোগ করা এই লাখ লাখ পেশাজীবীর জন্য সরকারি এমন অবকাঠামোগত ব্যর্থতা মেনে নেওয়া কঠিন। খাত-সংশ্লিষ্ট ও কমিউনিটি নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজার একবার হাতছাড়া হলে সেই শূন্যস্থান ভারত, পাকিস্তান বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো দখল করে নেবে, যা পরবর্তীতে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব।

দেশের এই উদীয়মান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে তৃণমূল পর্যায়ে আইটি পেশাজীবীদের জন্য অনতিবিলম্বে ডেডিকেটেড নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও নির্ভরযোগ্য ফাইবার অপটিক ইন্টারনেট সরবরাহ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হচ্ছে।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য