দেশে মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে সাইবার অপরাধ। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধান চালিয়ে এই অপরাধে যুক্ত দেশি-বিদেশি একাধিক চক্রের শীর্ষ পর্যায়ের অন্তত তিন শতাধিক সদস্যকে শনাক্ত করেছে। এই চক্রটি ডিজিটাল অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের নাম-পরিচয়, সিল ও সই জালিয়াতি করে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি এই অপরাধীরা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্যাড ও মন্ত্রীর জাল সই ব্যবহার করে মালদ্বীপে জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে একটি ভুয়া সুপারিশপত্র পাঠায়। নজরে আসার পর ডিবি-সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ অভিযান চালিয়ে চক্রটির পাঁচ সদস্য—ফারুক হোসেন, সাকিব খান, মাসুম মুনশী, মীর তৌহিদুল ইসলাম ও মো. বকুল মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের কাছ থেকে বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও সচিবদের নামে তৈরি ৪১টি জাল সিল, ৬ বান্ডিল অফিশিয়াল লেটারহেড এবং কম্পিউটার-ল্যাপটপ জব্দ করা হয়।
অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা পুলিশ সদর দপ্তরের
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার ও বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে ভিত্তিহীন, উসকানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানিয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। গতকাল এক বিবৃতিতে পুলিশ জানায়, কুচক্রী মহলের ছড়ানো বিভ্রান্তিকর কোনো বক্তব্য বিশ্বাস, শেয়ার বা প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে সাধারণ জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অত্যন্ত সংঘবদ্ধ। এরা মন্ত্রীদের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট খুলে বিভিন্ন সুবিধা আদায় ও জালিয়াতি করে আসছিল।”
অনলাইন জুয়া ও পাচার
তদন্তে দেখা গেছে, সাইবার অপরাধীদের একটি বড় অংশ অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সক্রিয়। এমএফএস (MFS) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে এবং এর সিংহভাগই আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
সিআইডির সাইবার ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, মোট অপরাধের ৪৫.৫২ শতাংশই অনলাইন প্রতারণা এবং ২৯.১৪ শতাংশ অনলাইন হয়রানি। সিআইডি সাইবার পুলিশ সেন্টারে বর্তমানে ২৫৮টি মামলা ও সাড়ে ৬ শতাধিক জিডির তদন্ত চলছে। তা ছাড়া ডিবির সাইবার ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে প্রতিদিন গড়ে ৪৫ জনেরও বেশি ভুক্তভোগী সরাসরি এসে অভিযোগ দায়ের করছেন।
ভুক্তভোগী নারী ও পৃথক ইউনিটের দাবি
পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, সাইবার অপরাধের বড় শিকার হচ্ছেন কিশোরী ও তরুণীরা। তবে সামাজিক বাধার কারণে প্রায় ৮৯ শতাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগ দায়ের করেন না। গত ৫ বছরে বিভিন্ন প্রযুক্তিভিত্তিক আইনে ৪ হাজার ৭৯৪টি মামলা দায়ের হলেও পৃথক ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ না থাকায় তদন্তে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে গত ১১ মে সরকার পৃথক সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা প্রকাশ করে।
সাইবার অপরাধ ও গুজবকে বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় সামাজিক সংকট উল্লেখ করে মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজি) আলী হোসেন ফকির বলেন, “সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিতে দক্ষতা বৃদ্ধি ও ডিজিটাল ফরেনসিক জ্ঞানার্জনের বিকল্প নেই। কোনো ধরনের প্রলোভন বা ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে তদন্ত পরিচালনা করতে হবে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাইবার অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, অপপ্রচার ও জালিয়াতির সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা কেবল আইন প্রয়োগ নয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছেন।


