২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। সেই ঘটনার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজপথে নেমে এসে নজিরবিহীন আন্দোলন গড়ে তুলেছিল শিক্ষার্থীরা। তারা লাইসেন্স ও যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল সড়ক ব্যবস্থাপনার চরম বিশৃঙ্খলা। আন্দোলনের মুখে নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নসহ নানা আশ্বাস দিয়েছিল তৎকালীন সরকার।
তবে সেই আন্দোলনের আজ ৮ বছর পূর্ণ হলেও বাস্তব পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। পরিসংখ্যান বলছে, যে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল, আজ তারাই সড়কের সবচেয়ে বড় শিকার। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে সাত বছরে সড়কে ৭ হাজার ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রতি সাতজন নিহতের একজন শিক্ষার্থী
একই সময়ে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৪৮ হাজার ৭১৩ জন নিহত হয়েছেন। সেই হিসাবে সড়কে মোট প্রাণহানির প্রতি সাতজনের মধ্যে একজনই শিক্ষার্থী। বছরে গড়ে সড়কে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮।
বিশেষজ্ঞ ও সংগঠনগুলোর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নিহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪৫.১৯ শতাংশের (৩,৩২৮ জন) বয়স ৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এরা মূলত স্কুল ও মাদ্রাসার শিশু-কিশোর। বাকি ৫৪.৮১ শতাংশ (৪,০৩৬ জন) ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ কর্মক্ষম অংশই সড়কে ঝরে পড়ছে। গ্রামীণ সড়কে ফুটপাত ও গতি নিয়ন্ত্রক না থাকায় অটোরিকশা বা পণ্যাবাহী গাড়ির ধাক্কায় শিশুরা এবং আঞ্চলিক ও মহাসড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তরুণ শিক্ষার্থীরা বেশি মারা যাচ্ছেন।
উদ্যোগ আছে, শৃাংলা নেই
গত দেড় দশকে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণে এক লাখ কোটি টাকার বেশি খরচ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১১ হাজার ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ঢাকা-ভাঙ্গা ৫৫ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়েতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০১ কোটি টাকা। কিন্তু বিপুল অর্থের অবকাঠামো হলেও বেপরোয়া গতি ও তদারকির অভাবে এই আধুনিক সড়কেও প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে।
সম্প্রতি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহত হওয়ার সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি জানিয়েছেন, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল বন্ধে নতুন নীতিমালা, ৬০ হাজার চালকের প্রশিক্ষণ এবং আগামী বছরের মধ্যে একটি সমন্বিত নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের কাজ চলছে।
তবে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান মনে করেন, শুধু জাতিসংঘে অঙ্গীকার কিংবা বড় অবকাঠামো নির্মাণ করলেই সড়ক নিরাপদ হবে না। পরিবহন খাতের চাঁদাবাজ ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব ভেঙে অদক্ষ চালক ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে স্থায়ী ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিশুদের ভবিষ্যতের ওপর জোর দিয়েছেন উল্লেখ করে তারা জানান, নতুন সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো সড়কে শিক্ষার্থীদের অকাল মৃত্যু ঠেকাতে বাস্তবে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।


