কয়েক ঘণ্টার টানা বর্ষণে ফের দেখা মিলল রাজধানীর নগর ব্যবস্থাপনার পুরনো চিত্র। আগের রাতভর বৃষ্টি আর গতকাল ভোর থেকে টানা বর্ষণ রাজধানীর প্রধান সড়ক, অলিগলি, ফুটপাত, বাসস্ট্যান্ড, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা পানিতে ভাসিয়ে দেয়। কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও কোমরসমান। কোনো কোনো এলাকায় ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও ভবনের গ্যারেজে ঢুকে পড়েছে পানি। জলাবদ্ধতায় একদিকে থমকে যায় যান চলাচল, অন্যদিকে গণপরিবহন সংকটে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীসাধারণকে। এই সুযোগে রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা ও রাইড শেয়ারিং সেবার ভাড়া বেড়ে যায় দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ পর্যন্ত। জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগে পড়ে রাজধানীবাসী।
গতকাল রবিবার পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, দোলাইরপাড়, গুলিস্তান, রামপুরা, খিলগাঁও, মিরপুর, বনানী, গুলশান, ফার্মগেট, ধানমণ্ডি, নীলক্ষেত, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কালশী, মহাখালী, মগবাজার, বিমানবন্দর সড়ক, শ্যামলী, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, কারওয়ান বাজার, উত্তরাসহ রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকায় তৈরি হয় জলাবদ্ধতা, যানজট ও দুর্ভোগ।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আর সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ২৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, জলাবদ্ধতায় থমকে যায় রাজধানীর স্বাভাবিক জীবন। অফিসগামী মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থেকেও গাড়ি পাননি। অনেকে জুতা হাতে নিয়ে পানির মধ্যে হেঁটেছেন। কেউ রাবারের স্যান্ডেল পরে অফিসে গেছেন, জুতা ব্যাগে বহন করেছেন। দুপুর পর্যন্ত কোথাও ঠিকভাবে রিকশা পাওয়া যায়নি, পাওয়া গেলেও ভাড়া গুনতে হয়েছে দুই-তিন গুণ।গণপরিবহন সংকট, তীব্র যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া, ডুবে যাওয়া ফুটপাত আর ম্যানহোল আতঙ্ক—সব মিলিয়ে গতকাল রাজধানীজুড়ে তৈরি হয় দুর্বিষহ পরিস্থিতি।
ভেসে গেছে নিউমার্কেট এলাকার সড়ক : নিউমার্কেট এলাকার ১ নম্বর গেট থেকে নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত সড়কটি মুহূর্তে বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শাহনেওয়াজ হলসংলগ্ন এলাকা থেকে পুরো সড়কে ছিল কোমরসমান পানি। পানির নিচে কোথায় রাস্তা, কোথায় ড্রেন, কোথায় ম্যানহোল—কিছু বোঝা যাচ্ছিল না। এ পরিস্থিতিতে রাস্তায় নামা মানুষের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে ভ্যান। ভ্যানচালকরা সাময়িকভাবে যাত্রী পারাপার শুরু করেন। জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া নিয়ে তাঁরা মানুষকে এক পাশ থেকে অন্য পাশে পৌঁছে দেন। প্রতিটি ট্রিপে চার থেকে পাঁচজন যাত্রী বহন করতে দেখা যায়। বৃষ্টির মধ্যে অফিসগামী নারী-পুরুষ, শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ—সবাই ভ্যানে উঠতে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। অনেককে জুতা-স্যান্ডেল হাতে নিয়ে ভ্যানের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
টানা বর্ষণে দুপুরের দিকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাকলী র্যাম্পের নিচের অংশসহ বনানী, খিলক্ষেতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে তীব্র যানজট দেখা দেয়। এদিকে টানা বৃষ্টিতে মতিঝিল-কমলাপুর এলাকা পানিতে ডুবে যায়। নটর ডেম কলেজের সামনের সড়ক, আরামবাগ থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনমুখী সড়ক এবং আরামবাগ মোড় থেকে ফকিরাপুল-কাকরাইল পর্যন্ত সড়ক তলিয়ে যায় পানির নিচে। কোথাও ছিল হাঁটুপানি, কোথাও কোমর পর্যন্ত। বাংলাদেশ ব্যাংক কলোনি ও এজিবি কলোনির ভেতরেও জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। ওখানকার বিভিন্ন ভবনের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ে। এতে দুর্ভোগে পড়েন এখানকার বাসিন্দারা।
সচিবালয়ের ভেতরে হাঁটুপানি : গতকাল দেশের শীর্ষ প্রশাসনিক দপ্তর বাংলাদেশ সচিবালয়ের অভ্যন্তরের বিভিন্ন স্থানেও পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। সচিবালয়ের প্রধান (১ নম্বর) প্রবেশ গেট দিয়ে ঢুকেই হাঁটুসমান পানির মুখোমুখি হতে হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। প্রধান প্রবেশপথ থেকে শুরু করে একাধিক ভবনের সামনের চত্বর, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও গণমাধ্যম কেন্দ্রে যাওয়ার পথ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।
সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের চারপাশ, ৭ নম্বর ভবনের সামনে ও পেছনের অংশ, ক্লিনিক ভবনের পূর্ব ও উত্তর পাশের চত্বর পানির নিচে তলিয়ে যায়। এ ছাড়া ৩ ও ৪ নম্বর ভবনের মাঝখানের সড়ক পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় চলাচল ব্যাহত হয়। ৩ নম্বর ভবনের মাঝখানে থাকা বাগানও পানির নিচে চলে যায়।
গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তা এম এ আবুল হাসনাত জানান, অতিরিক্ত বর্ষণের ফলে বৃষ্টির পানি অপসারণের ড্রেন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উপচে পড়ায় সচিবালয়ে হাঁটুপানি জমেছে। গণপূর্তের কর্মীরা সচিবালয়ের ভেতরে জমে থাকা হাঁটুপানি অপসারণে কাজ করছেন। বিকেল নাগাদ সচিবালয় জমে থাকা বৃষ্টির পানি মুক্ত হয়েছে।
মিরপুরকে নাম দেওয়া হয় ‘মিনি কক্সবাজার’ :
সরেজমিনে দেখা গেছে, গতকাল রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মিরপুর-১০, মিরপুর-১২, কালশী ও পূর্ব শেওড়াপাড়ার বিভিন্ন এলাকায় কোমরসমান পানি জমেছে।
ইব্রাহিমপুর পাকার মাথা থেকে শেওড়াপাড়া মেট্রো স্টেশন পর্যন্ত সড়কজুড়ে ছিল পানি। স্থানীয়রা মজা করে এলাকাটিকে ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে ডাকছিলেন। কেউ বলছিলেন, ‘রাস্তা নয়, নদী হয়ে গেছে।’ অনেক বাড়ির নিচতলা, দোকান এবং গ্যারেজেও ঢুকে পড়ে বৃষ্টির পানি। বহু ব্যক্তিগত গাড়ি পানির মধ্যে আটকা পড়ে। কাজীপাড়ার বাসিন্দা মো. আবদুল্লাহ বলেন, ‘রাস্তায় কোনো রিকশা পাচ্ছিলাম না। যাও পেলাম ভাড়া চাইছিল দ্বিগুণ। আগারগাঁও পর্যন্ত যাওয়ার পর গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। পরে পানি ভেঙে হেঁটেই যেতে হচ্ছে।’
বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষার দীর্ঘ সময় : মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, মিরপুর, মহাখালী, ফার্মগেট, কাকলীসহ বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে সকাল থেকেই ছিল মানুষের দীর্ঘ সারি। সড়কে বাস কম থাকায় যেগুলো আসছিল, সেগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। অনেক বাস স্টপেজেই থামছিল না।
মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে ফাতেমা আক্তার নামের এক চাকরিজীবী বলেন, ‘এক ঘণ্টার বেশি অফিসের সময় চলে গেল এখনো দাঁড়িয়ে আছি, বাসই পাচ্ছি না। সিএনজিও কম, তা ছাড়া কয়েক গুণ বেশি ভাড়া চাচ্ছে।’
মহাখালী থেকে বিমানবন্দর যানজটের হাব : মহাখালী, কাকলী, বনানী, চেয়ারম্যানবাড়ী, খিলক্ষেত হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত পুরো সড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। পানি জমে থাকায় যানবাহন অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছিল। কয়েক শ মিটার যেতে লেগে যাচ্ছিল ২০ থেকে ৩০ মিনিট। টঙ্গিগামী লিয়াকত আলী বলেন, ‘মনে হচ্ছে আজ কর্মস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। আর কখনো এমন দুর্ভোগে পড়তে হয়নি।’
এদিকে মেট্রো রেল চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও মিরপুর-১০ স্টেশনের নিচে নামার সিঁড়ি ও লিফটের চারপাশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। অনেককে স্টেশনের ভেতর বা ফুট ওভারব্রিজে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
ড্রেনের ময়লা পানি ওপরে : রাজধানীর বহু এলাকায় ফুটপাত সম্পূর্ণ পানির নিচে চলে যাওয়ায় ড্রেন উপচে ময়লার পানি সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও পানির নিচে ম্যানহোল ঢাকা পড়ায় আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করতে হয়েছে পথচারীদের। রাহমান নাসির নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘জুতা ও ফরমাল ড্রেস পরে বের হলে নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ব্যাগে নিয়েছি।’
জলাবদ্ধতায় ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা : শুধু যাতায়াত নয়, বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। মালবাহী ভ্যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বাজারে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হয়। অনেক দোকানপাট খুললেও ক্রেতার উপস্থিতি ছিল খুব কম। বাড্ডা এলাকার এক ভ্যানচালক বলেন, ‘আজ মাল বহনের কাজ নেই। মানুষ পার করেই কিছু আয় করছি।’
এদিকে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে রাজধানীর বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। অভিভাবকদের অনেকে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের স্কুলে পাঠানো নিরাপদ না।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল ও জলাধার দখল, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, নিয়মিত খাল ও নালা পরিষ্কার না করা এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে রাজধানী অচল হয়ে পড়ে। তাঁদের মতে, শুধু জরুরি ভিত্তিতে পানি সরিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত ড্রেনেজ পরিকল্পনা, খাল পুনরুদ্ধার, জলাধার সংরক্ষণ এবং পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ নিশ্চিত করা।
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘রাজধানীর জলাবদ্ধতার মূল কারণ অতিরিক্ত বৃষ্টি নয়, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা। শুধু কৃত্রিম ড্রেন নির্মাণ করে দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়। একটি আদর্শ ড্রেনেজ সিস্টেমে বৃষ্টির পানি সরাসরি নদীতে যাওয়ার আগে তা সাময়িকভাবে ধরে রাখার জন্য পর্যাপ্ত জলাশয় বা রিটেনশন পন্ডের প্রয়োজন হয়, যার ঘাটতি রয়েছে রাজধানীতে।’


