Homeজাতীয়ডুবে আছে এলাকা, ভেলায় করে লাশ নেওয়া হলো দূরে

ডুবে আছে এলাকা, ভেলায় করে লাশ নেওয়া হলো দূরে

চারদিকে থই থই বন্যার পানি। ঘরের ভেতরও পানি। আশপাশে শুকনো জায়গা নেই কোনো। এ অবস্থায় মোহাম্মদ ফোরকানের মৃত্যু হলে তাঁর মরদেহ তোলা হয় ভেলায়। ভাসিয়ে নেওয়া হয় প্রায় ৩০০ মিটার দূরে। এরপর অটোরিকশায় করে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে তাঁর দাফন সম্পন্ন করেন স্বজন ও এলাকাবাসী।

ঘটনাটি ঘটেছে গত শুক্রবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বন্যাদুর্গত এলাকায়।

মোহাম্মদ ফোরকানের বাড়ি উপজেলার জনার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের কেঁওচিয়া গ্রামে। শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে মারা যান তিনি। পরে রাতে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। ফোরকান ছিলেন অটোরিকশাচালক।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বন্যার পানিতে ফোরকানের ঘর, উঠান, পারিবারিক কবরস্থানসহ পুরো এলাকা ডুবে ছিল। এর মধ্যে শুক্রবার সকালে বন্যার পানিতে জাল দিয়ে মাছও ধরেন তিনি। হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন। পরে বাড়িতেই তাঁর মৃত্যু হয়। তবে ঘর-উঠান বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় বাড়িতে লাশের গোসল করানো সম্ভব হয়নি। পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করারও উপায় ছিল না।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বন্যার কারণে বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরের দস্তিদারহাটে নিয়ে গিয়ে ফোরকানের লাশের গোসল করানোসহ দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। পরে ওই এলাকার ফকিরমুড়া ঈদগাহ এলাকায় রাত ১০টার দিকে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পাহাড়ের খাস জায়গায় দাফন করা হয় তাঁকে। জানাজায় ইমামতি করেন তাঁর বড় ছেলে হাফেজ রাশেদুল ইসলাম।

বাড়ির পাশেই তাঁদের পারিবারিক কবরস্থান আছে উল্লেখ করে ফোরকানের আরেক ছেলে রাসেল উদ্দিন বলেন, ‘আমার দাদা-দাদিসহ পরিবারের মৃত ব্যক্তিদের পারিবারিক করবস্থানে কবর দেওয়া হয়েছে। বাবাও বলতেন, তাঁকে যেন দাদা-দাদির পাশেই কবর দিই। কিন্তু বন্যার কারণে বাবার সেই ইচ্ছা পূরণ করা সম্ভব হলো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাবা যখন মারা যান, তখন আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে কোমরসমান পানি ছিল। তাই বাবাকে দূরের পাহাড়ে কবর দিতে হয়েছে।’

জনার কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্যানেল চেয়ারম্যান মো. মহসিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গতকাল রোববার দুপুরে বলেন, ‘এখনো ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা পানিতে ডুবে আছে। ফোরকানদের বসতবাড়ি, কবরস্থান ও চলাচলের পথ প্লাবিত থাকায় তাঁর লাশ ভেলায় করে শুকনা স্থানে নিয়ে যেতে হয়েছে। এরপর অনেক দূরে সরকারি জায়গায় উন্মুক্ত কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।’

জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, মাছ ধরতে গিয়ে ওই ব্যক্তি স্ট্রোক করেন। পরে বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। বন্যাকবলিত এলাকাটি থেকে কিছুটা দূরে নিয়ে গিয়ে সরকারি খাস জায়গায় লাশ দাফন করা হয়। মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমাদের অনেক স্বেচ্ছাসেবক দল প্রস্তুত ছিল। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হলে আমরা দাফনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতাম।’

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বন্যার পানিতে ডুবে রয়েছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার অনেক এলাকা। তবে গত দুই দিন বৃষ্টি কম হওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে; যদিও এখনো সাতকানিয়া পৌরসভা ও উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন কমবেশি প্লাবিত রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। পানিবন্দী হয়ে রয়েছেন প্রায় চার লাখ মানুষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার গতকাল দুপুরে বলেন, সাঙ্গু নদের সাতকানিয়া অংশে পানি এখনো বিপৎসীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সাগরে উঁচু জোয়ার থাকায় এবং পাহাড়ে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি দ্রুত কমছে না।

সাতকানিয়ার বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে জানিয়ে সাতকানিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামছুজ্জামান বলেন, ‘তবে আজ (গতকাল) সকাল থেকে আবারও ভারী বর্ষণ শুরু হওয়ায় নতুন করে ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।’

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য