চীন, ভারত, পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার ভোক্তারা এখন সরাসরি বাংলাদেশের কৃষক বা উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে তাদের পছন্দসই কৃষি ও শিল্পপণ্য কিনতে পারবেন। এর জন্য কোনো ব্যাংকে ঋণপত্র বা এলসি (LC) খুলতে হবে না, লাগবে না কোনো কাগজের নথিপত্র। কোনো মধ্যসত্বভোগী বা এজেন্ট ছাড়াই সরাসরি অনলাইনে পণ্য আমদানি-রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে দেশে প্রথমবারের মতো ‘ক্রস বর্ডার (আন্তসীমান্ত) ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬’ অনুমোদন দিতে যাচ্ছে সরকার।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির খসড়াটি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধনের পর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের বিষয়ে ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন। বর্তমানে বিশ্বের খুচরা বাণিজ্যের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ অনলাইনে সম্পন্ন হয়। ট্রিলিয়ন ডলারের এই আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কেন এই নীতিমালা? বর্তমানে ছোট ছোট উদ্যোক্তারা বিদেশে কোনো পণ্য, ফলমূল বা সবজি রপ্তানি করতে চাইলে তা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে না পাঠিয়ে ‘লাগেজ পার্টি’র মাধ্যমে পাঠান। ফলে এর বিপরীতে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা হুন্ডি বা অন্য কোনো অবৈধ মাধ্যমে দেশে আসে। একইভাবে দেশে নীতিমালা না থাকায় বাংলাদেশি ভোক্তারাও অ্যামাজন বা আলিবাবার মতো বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে সরাসরি পণ্য কিনতে গিয়ে পেমেন্ট জটিলতায় পড়েন। এই দুটি প্রধান সমস্যার স্থায়ী সমাধান করবে নতুন এই নীতিমালা।
খসড়া নীতিমালার মূল দিকগুলো:
- সহজ পেমেন্ট ব্যবস্থা: অনলাইনে পেমেন্ট প্রক্রিয়া সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বয়ে ‘ক্রসবর্ডার এস্ক্রো সার্ভিস’ চালু করা হবে।
- রপ্তানিতে প্রণোদনা: দেশীয় পণ্য রপ্তানি বাড়াতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে। এছাড়া বিদেশে বেসরকারি উদ্যোগে প্রসেসিং সেন্টার ও ওয়্যারহাউস স্থাপনে নীতিগত সুবিধা দেবে সরকার।
- বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যবাধকতা: অ্যামাজন বা আলিবাবার মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে পণ্য বিক্রি করতে চাইলে তাদের বিক্রয়োত্তর সেবার জন্য স্থানীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশে কোম্পানি স্থাপন ছাড়া কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে না।
- ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা: ডিজিটাল বাণিজ্যের আড়ালে নকল বা ভেজাল পণ্য কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া অনলাইন লটারি, জুয়া, বেটিং, গেমিং এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো গিফট কার্ড বা ডিজিটাল ভাউচার কেনাবেচা করা যাবে না।
উদ্যোক্তা ও অর্থনীতির সুফল নতুন এই নীতিমালা কার্যকর হলে দেশের দারাজ, অথবা ডট কম, কিংবা বিক্রয় ডট কমের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে পণ্য রপ্তানি করতে পারবে। পাশাপাশি জামদানিসহ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তারা এবং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের পণ্য সরাসরি বিশ্ববাজারে বিক্রির সুযোগ পাবে। উদাহরণস্বরূপ, চীন বাংলাদেশ থেকে আম, কাঁঠাল ও পেয়ারার মতো ফল আমদানিতে আগ্রহী। এলসি খোলার জটিলতা না থাকায় এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো আম চাষি অনলাইনে ছবি দিয়ে সরাসরি চীনের ভোক্তার কাছ থেকে অর্ডার নিতে পারবেন।
প্রাণ আরএফএল গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক এবং ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দারাজের সাবেক সিইও সৈয়দ মোস্তাহিদল হক বলেন, “বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ অনলাইন প্রতিষ্ঠান চীন থেকে পণ্য এনে ব্যবসা করছে, ফলে দেশীয় পণ্যের প্রসার হচ্ছে না। এই নীতিমালার মাধ্যমে দেশীয় পণ্য আন্তর্জাতিক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ঢোকার সুযোগ পাবে। আগে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দু-একটি জামদানি শাড়ি বা পাঞ্জাবি বিদেশে পাঠাতে পেমেন্টসহ নানা জটিলতা হতো, নতুন নীতিমালা এলে সেই সমস্যা আর থাকবে না।”


