Homeআন্তর্জাতিকহরমুজ ফের বন্ধের ঘোষণা তেহরানের

হরমুজ ফের বন্ধের ঘোষণা তেহরানের

হরমুজ ফের বন্ধের ঘোষণা তেহরানের

মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা বাড়ার প্রেক্ষাপটে ইরান জর্দান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও ওমানে ক্ষেপণাস্ত্র এবং আত্মঘাতী ড্রোন হামলার দায় স্বীকার করেছে। অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের ১৪০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর শহর বান্দার আব্বাস, সিরিক, চাবাহার, বান্দার-ই দেয়র, জাস্ক ও আসালুয়েহে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।

এই সংঘাত শুরু হয়েছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী হরমুজ প্রণালিকে ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ’ ঘোষণা করার এবং তাদের ভাষায় একটি অননুমোদিত পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকারী একটি জাহাজে গুলি চালানোর কথা জানানোর পর।

ওমান সরকার জানিয়েছে, আক্রান্ত পণ্যবাহী জাহাজ জিএফএস গ্যালাক্সি কার্গো থেকে ২৩ জন নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে। দেশটির সামুদ্রিক নিরাপত্তা কেন্দ্র জানিয়েছে, তারা জাহাজটির নিখোঁজ এক সদস্যের সন্ধান এখনো চালাচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগে জানিয়েছিল, বাণিজ্যিক জাহাজটিতে ইরানি হামলার পর একজন ভারতীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন এবং ১০ জন নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে।

পরে ওমান সরকার এক বিবৃতিতে জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটি থেকে ২৩ জন নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে। এদিকে ওমানে মার্কিন দূতাবাস আমেরিকানদের নিজ নিজ স্থানে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার জন্য সতর্ক করেছে।

পাঁচ উপসাগরীয় দেশে হামলা : গত মাসে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে তীব্র মার্কিন বোমাবর্ষণের জেরে তেহরান বেশ কয়েকটি জিসিসি দেশের বিরুদ্ধে পাল্টা জবাব দিয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় দফা হামলার পর ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে, যা চলমান সংঘাতকে আরো গুরুতর করে তুলেছে।

রবিবার তেহরান বাহরাইন, কুয়েত, জর্দান, কাতার ও ওমানে হামলার দায় স্বীকার করে বলেছে, এটি তাদের দক্ষিণ উপকূলবর্তী শহরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে চালানো বোমা হামলার জবাব। ইরানের প্রভাবশালী সদস্য সংসদের স্পিকার এবং প্রধান শান্তি আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রবিবার বলেছেন, ‘একতরফা চুক্তির যুগ শেষ হয়ে গেছে। আমরা আপনাদের বলেছিলাম : কথা রাখুন, নইলে মূল্য দিতে হবে। বাস্তবতা এসে গেছে।’  গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে।তাঁর এই বিবৃতির পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তাঁর বাবার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।

বিশ্লেষকরা যা বলছেন : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ভঙ্গুর সমঝোতা স্মারকটিতে বেশ কয়েকটি সুস্পষ্ট ফাঁক ছিল, যা পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার পথ খোলা রেখেছিল। গত সোমবার হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা আবারও ছড়িয়ে পড়ে, যখন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ওমানের উপকূলে কাতারের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ট্যাংকারসহ তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। পরদিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় এবং তেহরান এর জবাবে উপসাগরজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যার ফলে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।

পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত ছিল। শনিবার রাতে, আইআরজিসি একটি কনটেইনার জাহাজে হামলার পর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে। জাহাজটি তাদের মতে একটি অননুমোদিত পথ ব্যবহার করছিল। রবিবার প্রণালিটিতে থাকা দ্বিতীয় একটি জাহাজ আক্রান্ত হয়।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরেস্তান প্রদেশের ভাইসিয়ান শহরের উপকণ্ঠে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং আরেকটি হামলায় ইরানের খোন্দাবের একটি সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে। আর ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলবর্তী বুশেহর প্রদেশের কর্মকর্তারা স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী প্রদেশটির আসালুয়েহ, দির, বুশেহর, দাশতি ও তাঙ্গেস্তানসহ পাঁচটি শহরে হামলা চালিয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, প্রাণহানির সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পর্যালোচনাধীন রয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে চলমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে তেহরান উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (জিসিসি) দেশগুলোকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ও আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে সক্রিয়ভাবে মার্কিন সামরিক অভিযানকে সমর্থন করার জন্য অভিযুক্ত করে আসছে।

হরমুজে সেবা ফি দিতে ইউরোপ সম্মত : বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে টোল আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা। টোল বাধ্যতামূলক নাকি স্বেচ্ছাধীন হবে, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন কী বলে এবং প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব প্রশ্নে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ওমানসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। তবে ইউরোপের দেশগুলো ‘নেভিগেশন ফি’ অর্থাৎ জাহাজ চলাচলে পরিষেবার বিনিময়ে ‘ফি’ দেওয়ার একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে।

হরমুজ সচলে ওমানের নতুন প্রস্তাব : কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে নতুন ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছে ওমান। মাসকাটে ইরানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সময় ওমানের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব আনা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি দুটি পৃথক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করা হবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। অবশ্য প্রস্তাবিত এই চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে চুক্তিটি কার্যকর হলে হরমুজ প্রণালির উত্তর ও দক্ষিণ, উভয় দিকের নৌপথই জাহাজ চলাচলের জন্য খোলা থাকবে।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য