তিন দশক আগের পুরোনো অত্যাবশ্যকীয় ওষুধনীতিতে ফিরেছে সরকার। কিন্তু ওই তালিকায় থাকা ১১৭টি ওষুধের মধ্যে বর্তমানে দেশের বাজারে সরবরাহ রয়েছে মাত্র ৬০টির। বাকি ৫৭টি ওষুধের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
গত ১০ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীর মিটফোর্ড, কলাবাগান, গুলশান ও শাহবাগ এলাকার মোট আটটি ফার্মেসিতে এই ১১৭টি ওষুধের মজুত ও বিক্রির তথ্য যাচাই করা হয়। ফার্মেসিগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয়ভাবে যেসব ওষুধকে সাধারণ মানুষের জন্য ‘অত্যাবশ্যকীয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই এখন রোগীর নাগালের বাইরে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, অনুপস্থিত এই ওষুধের তালিকায় রয়েছে চিকিৎসায় অপরিহার্য ও জীবনরক্ষাকারী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জেনেরিক। এর মধ্যে রয়েছে তীব্র ব্যথা নিয়ন্ত্রণের পেথিডিন, ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় ক্লোরোকুইন ও কুইনাইন, যক্ষ্মার চিকিৎসায় ইথামবিউটল ও আইসোনিয়াজিড, ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় গ্লিবেনক্লামাইড এবং উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের চিকিৎসায় নিফেডিপিন ও মেথাইলডোপা।
এ ছাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংক্রমণের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক, প্রসবকালীন অতিরিক্ত রক্তপাত রোধে ব্যবহৃত অক্সিটোসিন ও এরগোমেট্রিন, বিষধর সাপের কামড়ের প্রতিষেধক পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম এবং ডিপথেরিয়া, হাম ও পোলিওর মতো জীবনরক্ষাকারী টিকাও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। টিউবারকিউলিনসহ বিভিন্ন ইমেজিং পরীক্ষায় ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় কনট্রাস্ট এজেন্টগুলোর সরবরাহও সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
১৯৯৪ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী, দেশের ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মোট উৎপাদনের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই নির্দেশনা অতীতে কখনোই কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আকতার হোসেন জানান, অতীতে এই বাধ্যবাধকতা মানার ক্ষেত্রে কঠোরতা ছিল না। ব্যয়বহুল বা হাইটেক ওষুধের পেছনে ছুটলেও সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদনে একধরনের অনীহা লক্ষ্য করা যায়। তাঁর মতে, কেবল কমিটি গঠন করে বসে না থেকে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এখনই কঠোর তদারকি শুরু করা উচিত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, দেশে অনুমোদিত অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ৩০১টি। তবে বর্তমানে নিয়মিত ওষুধ উৎপাদন করে ১৫০ থেকে ২০০টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৫০ থেকে ৬০টি ওষুধ বিভিন্ন কম্পানি উৎপাদন করে না। আবার অনেক ওষুধ ভিন্ন নামে বাজারজাত করা হচ্ছে। ফলে সরকারি তালিকায় একটি জেনেরিক নাম থাকলেও রোগীর জন্য সেটি খুঁজে পাওয়া কঠিন।
যেসব ওষুধ বাজারে নেই
বাজারে না থাকা ওষুধের তালিকাটি বিশ্লেষণে সংকটের ব্যাপ্তি আরো স্পষ্ট হয়। তীব্র ব্যথা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত পেথিডিন, মানসিক রোগের চিকিৎসায় ক্লোরপ্রোমাজিন ও প্রোক্লোরপেরাজিনও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ক্লোরোকুইন, কুইনাইন, মেফ্লোকুইন, পাইরিমেথামিন-সালফাডক্সিন এবং মেফ্লোকুইন-পাইরিমেথামিন-সালফাডক্সিনের মতো ওষুধও বাজারে সরবরাহ নেই। এ তালিকায় রয়েছে যক্ষ্মার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ইথামবিউটল ও আইসোনিয়াজিড এবং কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ক্লোফাজিমিন ও ড্যাপসোন।
অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত গ্লিবেনক্লামাইড বাজারে সরবরাহ নেই। এ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত নিফেডিপিন, মেথাইলডোপা, বেন্ড্রোফ্লুয়াজাইড ও আইসোসরবাইড ডাইনাইট্রেট/মনোনাইট্রেটও বাজারে নেই।
অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে ক্লক্সাসিলিন, অ্যামক্সিসিলিন, অ্যাম্পিসিলিন, ক্লোরামফেনিকল, বেঞ্জাথিন পেনিসিলিন, বেঞ্জিল পেনিসিলিন ও প্রোকেইন বেঞ্জিল পেনিসিলিনের মতো ওষুধ বাজারে সরবরাহ নেই।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংক্রমণের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের সরবরাহ অনিশ্চিত হলে রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ওষুধগুলোর একটি পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম। বিষধর সাপের কামড়ে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ এই অ্যান্টিভেনমও বাজারে সরবরাহ নেই।
প্রসবকালীন জরুরি চিকিৎসায় ব্যবহৃত অক্সিটোসিন ও এরগোমেট্রিনও বাজারে সরবরাহ নেই। প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তপাত নিয়ন্ত্রণে এসব ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ। প্রসব-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তপাত মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ হওয়ায় জরুরি প্রসূতি সেবায় এসব ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংকট শুধু ওষুধে সীমাবদ্ধ নয়। ডিপথেরিয়া-পারটুসিস-টিটেনাস, ডিপথেরিয়া-টিটেনাস, হাম, পোলিও, ইয়েলো ফিভার ও মেনিনজোকক্কাল টিকাও তালিকায় থাকলেও বাজারে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
এ ছাড়া টিউবারকিউলিন যা যক্ষ্মা শনাক্তের ত্বক পরীক্ষায় ব্যবহৃত হয়, বিভিন্ন ইমেজিং পরীক্ষায় ব্যবহৃত মেগলুমিন আয়োগ্লাইকামেট, সোডিয়াম ডায়াট্রিজোয়েট ও সোডিয়াম আইওথালামেটের মতো কনট্রাস্ট এজেন্টও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না।


