বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদ উপাচার্য (ভিসি)। শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন, একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভিসির ভূমিকা অনস্বীকার্য। অথচ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছে না। নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রজ্ঞাপন বাতিল কিংবা অল্প দিনের ব্যবধানে ভিসিকে সরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও সামনে এসেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ৩০টি পদে ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, যোগ্যতা, গবেষণা ও একাডেমিক ডিগ্রির চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত পছন্দ, দলীয় ঘনিষ্ঠতা এবং তদবিরকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কোটি টাকারও বেশি আর্থিক লেনদেনের গুঞ্জন রয়েছে, যা নিয়ে শিক্ষক ও সচেতন মহলে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।
আইন লঙ্ঘন ও বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে অসঙ্গতি
বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন করে সংশ্লিষ্ট ডিসিপ্লিনের বাইরের শিক্ষককে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার একাধিক নজির মিলেছে। দেখা গেছে, গাজীপুর ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজির (ইউএফটিবি) উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোক্তার আলী, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে খ্যাতিসম্পন্ন ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে নিয়োগের স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
অপরদিকে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও আইন অমান্য করে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বহির্ভূত শিক্ষকদের প্রধান নির্বাহী করা হয়েছে।
এছাড়া সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে ব্যবসায় প্রশাসন বা মানবিক ডিসিপ্লিনের শিক্ষকদের শীর্ষ পদে বসানো হয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে অ-প্রযুক্তিগত বা ভিন্ন বিষয়ের শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা ও গবেষণার মান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
নিয়োগের পরই প্রজ্ঞাপন বাতিল ও প্রশাসনিক অস্থিরতা
ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে অপরিপক্বতা ও যাচাই-বাছাইয়ের অভাবের বড় প্রমাণ মেলে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায়। গত ১৪ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপককে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তা বাতিল করা হয়। একইভাবে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়ার ২৩ দিনের মাথায় আরেক ভিসিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক আনুগত্য ও লোভনীয় পদ
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিবর্তনের পরপরই দলীয় শিক্ষকরা ভিসির মতো লোভনীয় পদে বসতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন প্রকল্প, সংস্কার কাজ, টেন্ডার এবং শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন থাকায় পদটি অতিরিক্ত গুরুত্ব লাভ করে। সম্প্রতি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কর্তৃক একটি রাজনৈতিক দলের নতুন নেতাদের দলীয় প্যাডে অভিনন্দন জানানোর ঘটনায় তার নিরপেক্ষতা নিয়েও তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান জানান, আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ কোনোভাবেই কাম্য নয়। যদি নিয়োগে অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ মেলে, তবে তা অবিলম্বে খтиয়ে দেখে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।


