দেশের প্রন্তিক ও গ্রামীণ এলাকার অবকাঠামোগত মানোন্নয়নে সংসদ সদস্যদের (এমপি) জন্য বিশেষ বরাদ্দ বিপুল পরিমাণে বাড়াতে যাচ্ছে সরকার। আসনপ্রতি এই বিশেষ বরাদ্দ আড়াই গুণ বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকা থেকে ৫০ কোটি টাকা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্প প্রস্তাব থেকে জানা যায়, এই বর্ধিত সুবিধার প্রথম ধাপে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সুযোগ পাচ্ছেন ময়মনসিংহ বিভাগের সংসদ সদস্যরা। নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় তারা প্রতি বছর ১০ কোটি টাকা করে মোট পাঁচ বছরে ৫০ কোটি টাকা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে খরচের সুযোগ পাবেন। তবে অতীতে এমপিদের এই থোক বরাদ্দ কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ থাকায় বিশেষজ্ঞদের মাঝে আবারও অনিয়মের আশঙ্কা দানা বাঁধছে।
২০০৫ থেকে ২০২৬: প্রকল্পের বিবর্তন ও বর্ধিত বাজেট
সংসদ সদস্যদের বিশেষ থোক বরাদ্দের সূচনা হয়েছিল অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিএনপি সরকারের তৎকালীন মেয়াদে। সে সময় আসনপ্রতি ২ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তা পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে দ্বাদশ সংসদে ২৫ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার পুনরায় এই মেগা প্রকল্প চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নতুন এই প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এই বরাদ্দের অর্থ দিয়ে সংসদ সদস্যরা তাদের স্ব-স্ব এলাকায় অগ্রাধিকারভিত্তিতে কাঁচা-পাকা রাস্তাঘাট মেরামত, নতুন সড়ক নির্মাণ, ব্রিজ, কালভার্ট, হাটবাজার ও ঘাটের আধুনিকায়ন এবং বৃক্ষরোপণের মতো জনকল্যাণমুখী কাজ করতে পারবেন।
ময়মনসিংহ বিভাগে প্রথম ধাপের প্রয়োগ
প্রথম দফায় ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি সংসদীয় আসনের অবকাঠামো ঢেলে সাজাতে ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প ময়মনসিংহ বিভাগ’ শীর্ষক ১,৪৯৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকার প্রকল্প মে মাসে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিয়েছে এলজিইডি। এলজিইডির সহকারী প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ নিশ্চিত করেছেন যে, প্রকল্পটির ডিপিপি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ময়মনসিংহ বিভাগের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিভাগেও একই অনুকরণে প্রকল্প সম্প্রসারণ করা হবে।
প্রস্তাবিত ডিপিপি অনুযায়ী, ময়মনসিংহ বিভাগে প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার নতুন সড়ক উন্নয়ন, ১৭৯ কিলোমিটার বিদ্যমান সড়ক পুনর্বাসন, ৮৬৭ মিটার ছোট-বড় ব্রিজ নির্মাণ এবং ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪২০টি গাছ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২৩ মে প্রকল্প যাচাই কমিটির (পিইসি) সভায় পরিকল্পনা কমিশন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বাইরের পল্লী এলাকায় এই অর্থ খরচের নির্দেশনা যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে।
স্থানীয় এমপি ও বিরোধী দলের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
ময়মনসিংহ বিভাগের সংসদ সদস্যরা মনে করছেন, বর্তমান ভঙ্গুর গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার সাপেক্ষে ৫০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়। ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ জানান, গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল করতে এই বিনিয়োগ অত্যন্ত দরকারি। অতীতে ভুল-ভ্রান্তি বা অনিয়ম হলেও তা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার পুরোপুরি স্বচ্ছতা বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
অন্যদিকে, প্রকল্পে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন শেরপুর-১ (সদর) আসনের জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “উদ্যোগটি ভালো হলেও বরাদ্দ বণ্টনে আমরা রাজনৈতিক বৈষম্য দেখতে পাচ্ছি। আমার নির্বাচনী এলাকায় এখনো ৮০০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা ও ডজনখানেক ব্রিজ প্রয়োজন। সরকারি অর্থায়নে সকল আসনের জন্য সমান ও ন্যায়সঙ্গত বণ্টন নিশ্চিত হওয়া জরুরি।”
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ও অতীতের খতিয়ান
এমপিদের অধীনে থাকা এসব প্রকল্পের অতীত ইতিহাস খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় এর আগের প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া বিল তৈরি, নিম্নমানের সামগ্রীর ব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির প্রমাণ মিলেছিল। টিআইবির ২০২০ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এমপি ভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্তত ১৩ শতাংশ অর্থ কমিশন বাণিজ্যে লোপাট হতো এবং ৩৩ শতাংশ প্রকল্পের কাজের মান ছিল নিম্নমানের।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, “অতীতে অগণতান্ত্রিক ও কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যবস্থায় থোক বরাদ্দের নামে জনগণের অর্থ আত্মসাৎ এবং স্থানীয় পর্যায় দলীয় আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার বানানো হয়েছে। অতীত থেকে শিক্ষা না নিয়ে যদি জনপ্রতিনিধি ও তাদের নেতাকর্মীদের পরোক্ষ প্রভাব বজায় রাখা হয়, তবে ক্ষমতার রদবদল হলেও দুর্নীতির চিত্র একই থাকবে।”
অনুরূপ মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ। তাঁরা মনে করেন, এমপিদের একক আধিপত্য বন্ধ করে স্বাধীন ও কেন্দ্রীয় তদারকি কাঠামোর আওতায় এই প্রকল্পগুলোর হিসাব ও কাজের মান পরিদর্শনের কঠোর ব্যবস্থা রাখা আবশ্যিক। তা না হলে সরকারি কোষাগারের বিপুল অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।


