বিনিয়োগ নিয়ে ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে হঠাৎ তদন্তের জেরে নতুন করে চাপে পড়েছে দেশের শেয়ারবাজার। বড় অঙ্কের শেয়ার কিনলেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ তৈরি হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এক ধরনের আতঙ্ক, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাজারে অর্থপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
বাজারসংশ্লিষ্ট ও বিশ্লেষকদের মতে, অনিয়ম, কারসাজি এবং দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স বন্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর অবস্থান যেমন জরুরি, তেমনি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করাও আবশ্যক। কিন্তু বারবার নিয়ম পরিবর্তন ও ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক তদারকির ফলে নতুন করে গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সার্বিল্যান্স বিভাগ থেকে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউসে কোনো কারণ ছাড়াই ঝটিকা পরিদর্শন ও তদন্ত চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে। ব্রোকারেজ মালিকেরা জানিয়েছেন, বড় কোনো ক্রয় বা বিক্রয়াদেশ আসলেই বিএসইসি অথবা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে।
বিনিয়োগকারী আ. ন. ম. আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, “নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি বারবার নিয়ম পরিবর্তন করে, তবে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কোনো ব্যবসায়ী গ্রুপকে বেশি সুবিধা দিতে বা চাপে ফেলতে নীতি ব্যবহার করা হলে বাজার সঠিক পথে চলবে না। পরিচয়কেন্দ্রিক আচরণ পরিহার করে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে হবে।”
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত জুলাই মাসে সংস্কারের প্রত্যাশায় ডিএসইএক্স সূচক এক দিনেই ৪৫ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৯০৩ পয়েন্টে উঠেছিল এবং লেনদেন পৌঁছেছিল প্রায় ১ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকায়। অথচ বর্তমানে সেই চিত্রে বড় ধরনের ধস নেমেছে। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ছিল ৫ হাজার ৬৬২ পয়েন্টে। গতকাল তা মাত্র ৮ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৫৬৭ পয়েন্টে দাঁড়ায়। এর আগের দিন এক দিনেই সূচক পড়েছিল ১০৩ পয়েন্ট। গত ১৮ কার্যদিবসে সূচক কমেছে ৩০৬ পয়েন্ট বা প্রায় ৫ শতাংশ।
একই সঙ্গে লেনদেনের পরিমাণেও বড় ধস লক্ষ্য করা গেছে। গত ৪ আগস্ট ডিএসইতে দৈনিক লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ২১১ কোটি টাকা, যা ৩১ আগস্ট নেমে আসে মাত্র ৪৭৭ কোটি টাকায়। গতকাল লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র ১৮ কার্যদিবসের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। বাজারে বর্তমানে নতুন কোনো অর্থের প্রবাহ নেই; বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা কেবল এক শেয়ার বিক্রি করে অন্য শেয়ারে অর্থ স্থানান্তর করছেন।
ডিএসইর সাবেক পরিচালক আহমেদ রশীদ লালী জানান, শেয়ারবাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। অযাচিত হস্তক্ষেপ ও তদারকির নামে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হলে বাজার অস্থিতিশীল হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন আইপিও বিধিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রুত বাজারে নতুন কোম্পানি ও বিনিয়োগকারী আসবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও বাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, “সুবিধা দিয়ে হলেও ভালো ও বড় কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনতে হবে। আতঙ্ক সৃষ্টি করে এমন কার্যক্রম আস্থা নষ্ট করে। তবে বিএসইসি আইপিও, মার্জিন ঋণ ও জেড ক্যাটাগরির শেয়ার হস্তান্তরে কিছু ভালো পদক্ষেপ নিয়েছে। আশা করা যায়, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাজার ইতিবাচক ধারায় ফিরবে।”


