সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে দেশের ব্যাংকগুলোতে ব্যক্তি শ্রেণীর কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা বা ‘মাল্টিমিলিয়নেয়ার’ হিসাবের সংখ্যা অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে, তখন ব্যাংকগুলোতে কোটিপতি ব্যক্তির হিসাবের সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজারের ঘরে। কিন্তু মাত্র দেড় বছর পর সেই হিসাব সাড়ে ৪০ হাজার অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই স্বল্প সময়ে কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৭,০১৬টি, যা আগের তুলনায় প্রায় ২১ শতাংশ বেশি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল শেষ হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের ব্যাংকগুলোতে ১ কোটি টাকা বা তার বেশি আমানত জমা থাকা ব্যক্তি শ্রেণীর হিসাব সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৬২৯টি। দেড় বছর পর চলতি বছরের মার্চে এসে এ ধরনের হিসাব সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৬৪৫টিতে।
অর্থনীতির নিয়মে অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি
আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট ও অর্থনীতিবিদদের মতে, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনের সহযোগী অনেক অলিগার্ক, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। একই সময়ে দেশে চরম মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক স্থবিরতা ও মন্দা পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, যার ফলে দারিদ্র্যের হারও বৃদ্ধি পায়। এমন অর্থনৈতিক স্থবিরতার মধ্যেও মাত্র দেড় বছরের মধ্যে ব্যক্তি শ্রেণীর কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব এক-পঞ্চমাংশ বেড়ে যাওয়া সাধারণ অর্থনীতির নিয়মে অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, পটপরিবর্তনের পর দেশের হাট-বাজার, রাস্তাঘাট এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তরের নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির কর্তৃত্ব নতুন একটি গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়। রাজনীতি ও প্রশাসনে নতুন নিয়ন্ত্রক শ্রেণীর উত্থান ঘটে, যারা দ্রুত বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। মূলত অপরাধ ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে হঠাৎ ধনী হওয়া এই নতুন শ্রেণীর ব্যাংকমুখী হওয়াটাই কোটিপতি হিসাব বৃদ্ধির প্রধান কারণ হতে পারে।
পুলিশের একটি গোপনীয় প্রতিবেদনেও এই মূল্যায়নের সত্যতা পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রস্তুত করা পুলিশের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সে সময় চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের ৫৭ শতাংশই ছিলেন একদম নতুন অপরাধী, যাদের অতীতে কোনো ধরনের অপরাধের রেকর্ড ছিল না। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনে একদল নতুন মুখ উঠে এসেছিল।
তদারকি ও এফডিআর স্থানান্তরের যুক্তি
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ অবশ্য এই বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত চিত্র উন্মোচিত হতে শুরু করে এবং সুশাসনের অভাবে এক ডজনেরও বেশি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। ফলে আতঙ্কিত গ্রাহকরা দুর্বল ব্যাংকগুলো থেকে এফডিআর ভেঙে ভালো ব্যাংকগুলোতে টাকা সরিয়ে নেন। এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ভয় থেকে বাঁচতে মানুষ বাসায় রাখা টাকা ব্যাংকে জমা করে থাকতে পারে।
তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী অতিধনী হয়ে উঠেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ড. সালেহউদ্দিন স্বীকার করেন, “এর কিছুটা সত্য হতে পারে। কারণ এতদিন ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে ছিল, গণ-অভ্যুত্থানের পর তাদের হাতবদল হয়েছে। নতুন কিছু লোক নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হয়েছে। তারা টাকা ব্যাংকে রাখায় কোটি টাকার হিসাব বাড়তে পারে।”
এদিকে, ঘরে থাকা নগদ টাকা ব্যাংকে আসার যে তত্ত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যের সাথে মিলছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেটা বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের বাইরে সাধারণ মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ টাকা কমেনি, বরং বৃদ্ধি পেয়ে চলতি বছরের মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকায়।
আমানতের স্থিতি ও নতুন কোটিপতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ৩৩ হাজার ৬২৯টি কোটি টাকার ব্যাংক হিসাবে মোট আমানত জমা ছিল ৮৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চে ৪০ হাজার ৬৪৫টি হিসাবে জমা আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯১ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়।
একাধিক বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বা ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা জানান, অভিজ্ঞ ও পুরনো কোটিপতিরা সাধারণত ভ্যাট, ট্যাক্স বা অন্যান্য ঝামেলা এড়াতে এক ব্যাংক হিসাবে খুব বেশি অর্থ রাখেন না। তাঁরা টাকা ভাগ করে ছোট ছোট আমানত হিসেবে জমা রাখেন অথবা জমি, আবাসন বা বিদেশে পাচার করে বিনিয়োগ করেন। ফলে হুট করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিপুল সংখ্যক কোটি টাকার নতুন হিসাব তৈরি হওয়ার সহজ অর্থ হলো—এরা একদমই নতুন কোটিপতি, যারা অল্প সময়ে অবৈধ বা হঠাৎ উপার্জিত টাকা দ্রুত ব্যাংকে জমা করেছেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, “দীর্ঘদিন পর ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে রদবদল ঘটেছিল। তখন নতুন কিছু মানুষ ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন এবং অনেকে দ্রুত ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়া যান। কোটি টাকার হিসাব বাড়ার পেছনে এদের ভূমিকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।” তবে এর পাশাপাশি ব্যাংক খাতের অস্থিরতার কারণে এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে আমানত স্থানান্তরও কিছু ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান নিশ্চিত করেছেন যে, ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। অনিয়ম ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে কোটিপতি হিসাব বৃদ্ধির পেছনে কালো টাকা বা অবৈধ উপার্জনের ভূমিকা থাকলে তা তদন্ত করে চিহ্নিত করা হবে।
একই বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া এই তথ্য যদি সত্য হয়, তবে এটি অত্যন্ত গম্ভীর একটি বিষয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কীভাবে এত দ্রুত নতুন কোটিপতির জন্ম হলো, তা নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের দাবি রাখে এবং এটি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত পরিচালনা করা উচিত।


