Homeখেলামেসির সুরের শেষ অধ্যায়

মেসির সুরের শেষ অধ্যায়

বিশ্বকাপের মঞ্চে লিওনেল মেসির শেষ সুর বেজে উঠবে আজ নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। এই মাঠেই একদিন ব্রুস স্প্রিংস্টিন গেয়েছিলেন দ্য প্রমিজড ল্যান্ড, কোল্ডপ্লে মাতিয়েছে হাইয়ার পাওয়ার দিয়ে।সেই মঞ্চেই এবার নিজের শেষ বিশ্বকাপের ‘সিম্ফনি’ রচনা করতে নামবেন মেসি। শিল্পীরা যেমন নির্ধারিত গানের তালিকা নিয়ে মঞ্চে ওঠেন, মেসি তেমন নন। তাঁর পায়ের সুর কখনোই আগে থেকে লেখা থাকে না। প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি পাস, প্রতিটি ড্রিবল যেন নতুন এক সুরের জন্ম দেয়।এখন শুধু একটি প্রশ্ন—মেসির জাদুর ঝুলিতে কি আরো একটি স্মরণীয় মুহূর্ত বাকি আছে? উত্তর মিলবে স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল শেষে।

সুন্দর সব কিছুরই একদিন সমাপ্তি আসে। আর সেই সমাপ্তি সব সময়ই এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দেয়, যেখানে বিদায়ের বিষণ্নতা মিশে থাকে কৃতজ্ঞতার গভীরতায়। খেলাধুলার ফলাফল হয়তো স্কোরবোর্ডের সাদা-কালো সংখ্যায় লেখা থাকে, কিন্তু তার প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে অনুভূতির অসংখ্য রঙে।বছরের পর বছর যাঁদের নৈপুণ্য আমাদের মুগ্ধ করে, যাঁদের শিল্পে আমরা নিজেদের আবেগ জড়িয়ে ফেলি, তাঁরা যখন বিদায় নেন, তখন তৈরি হয় এক অপূরণীয় শূন্যতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শূন্যতা হয়তো কিছুটা পূরণ হয়, কিন্তু পুরোপুরি কখনোই নয়। যদি রাতে মেসি আরেকবার আরেকবার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন, তবুও মনে হবে ফুটবল তাঁর সবচেয়ে অপূর্ব এক শিল্পীকে বিদায় জানাতে চলেছে। কারণ ৩৯ বছর বয়সী মেসির এটিই হয়তো শেষ বিশ্বকাপ! তাঁর ক্যারিয়ারকে শুধু গোল কিংবা শিরোপার সংখ্যায় মাপা যায় না।

মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন মানুষকে বারবার বিস্মিত করার সেই বিরল ক্ষমতা।এমন সব মুহূর্ত তৈরি করা, যখন মনে হয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মও যেন তাঁর পায়ের জাদুর সামনে থমকে দাঁড়িয়েছে। এমন সব পাস, যা অন্য কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। এমন সব ড্রিবল, যেখানে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সঙ্গে সময়ও যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবলপ্রেমীরা এক বিরল সৌভাগ্যের সাক্ষী হয়েছে। তারা দেখেছে এমন একজন খেলোয়াড়কে, যিনি খেলাটিকে শুধু জয়ের জন্য খেলেননি; খেলেছেন আরো সুন্দর করে তোলার জন্য। শিশুরা তাঁর মতো হতে চেয়েছে, তরুণরা তাঁর ভিডিও দেখে ফুটবল শিখেছে, আর প্রতিপক্ষের সমর্থকরাও অনেক সময় নিজেদের অজান্তেই তাঁর জাদুতে হাততালি দিয়েছেন।

মেসি যুগের পরও ফুটবল চলবে। নতুন নক্ষত্রের জন্ম হবে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, লামিন ইয়ামাল, আর্লিং হালান্ড, জুড বেলিংহাম কিংবা আরো অনেকে আগামী দিনের ইতিহাস লিখবেন। স্টেডিয়াম ভরবে, নতুন চ্যাম্পিয়ন আসবে, নতুন রেকর্ড তৈরি হবে। কিন্তু কিছু শিল্পী থাকেন, যাঁদের বিদায়ের পরই বোঝা যায় তাঁরা কতটা অনন্য ছিলেন। তাঁদের জায়গা কখনো পূরণ হয় না; শুধু নতুন গল্প লেখা হয়। তাই আজকের ফাইনাল শুধু আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনাল নয়। এটি হয়তো একটি যুগের শেষ অধ্যায়। এমন এক অধ্যায়, যার শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার রোজারিওর এক ছোট্ট ছেলের স্বপ্ন দিয়ে। যে ছেলেটি বল পায়ে পৃথিবী জয়ের স্বপ্ন দেখেছিল, আর শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিল।

আজ যদি মেসি আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন, সেটি হবে তাঁর ক্যারিয়ারের আরেকটি অমর অর্জন। কিন্তু ট্রফির বাইরেও থেকে যাবে আরেকটি সত্য—ফুটবল এমন একজন শিল্পীকে পেয়েছিল, যিনি প্রতিটি ম্যাচকে পরিণত করতেন একেকটি কনসার্টে, প্রতিটি স্পর্শকে বানাতেন একেকটি সুর, আর প্রতিটি মুহূর্তকে রূপ দিতেন শিল্পকর্মে। হয়তো বহু বছর পরও মানুষ মনে রাখবে না আজকের ফাইনালের প্রতিটি পাস, প্রতিটি ট্যাকল কিংবা প্রতিটি পরিসংখ্যান। কিন্তু তারা মনে রাখবে, একদিন মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আলোয় ফুটবল তার সবচেয়ে মোহনীয় শিল্পীদের একজনকে শেষবারের মতো মঞ্চ ছাড়তে দেখেছিল। আর তখনো কোথাও না কোথাও বাজতে থাকবে সেই সুর, যে সুরের নাম লিওনেল মেসি।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য