Homeঅপরাধআতঙ্কের নাম ডেভিড ইমন, কেন ধরতে পারছে না পুলিশ

আতঙ্কের নাম ডেভিড ইমন, কেন ধরতে পারছে না পুলিশ

চাঁদা না পেয়ে বাসাবাড়ি কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা এখন আর শুধু সিনেমার গল্পে সীমাবদ্ধ নেই। বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত দেখা মিলছে এমন দুর্ধর্ষ অপরাধের। আর এই অপরাধ জগতের নেপথ্যে উঠে এসেছে এক নতুন আতঙ্কের নাম—মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন।

চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড কাঁপানো এই সন্ত্রাসীর একটি হোয়াটসঅ্যাপ কলেই এখন আতঙ্কে থাকেন বড় বড় ব্যবসায়ীরা। শুধু গত এক মাসেই তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে ফোন করে দেড় কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করেছেন তিনি। একের পর এক অপরাধ করে বেড়ালেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে হন্যে হয়ে খুঁজেও কোনো হদিস পাচ্ছে না।

২ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে ইন্টারনেট অফিসে হামলা ও লুটপাট সবশেষ গত সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নগরের চকবাজার থানার চন্দনপুরা-বাকলিয়া এক্সেস সড়কে অবস্থিত ‘ডিজিটাল ডট নেট’ (ডিডিএন) নামের একটি ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে সিনেমার স্টাইলে দিনদুপুরে হামলা চালানো হয়। ডেভিড ইমনের নির্দেশে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী এই হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় প্রতিষ্ঠানটিতে বেতনের জন্য রাখা ৩৫ লাখ টাকা লুটে নেয় তারা।

এর আগে গত শনিবার (১১ জুলাই) ডিডিএন-এর মালিক আদিল বিন মামুনের মোবাইলে একটি বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে নিজেকে ডেভিড ইমন পরিচয় দিয়ে এককালীন ২ কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। টাকা না দিলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ইমন ফোনে বলেন, “আপনি আমার ডিটেইলস পুলিশ কমিশনার থেকে জিজ্ঞেস করেন। বেশি বাড়াবাড়ি করলে স্মার্ট গ্রুপের মুজিবের ঘরে কী হয়েছিল ওটা দেখেছেন তো।” এই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও গতকাল মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) পর্যন্ত জড়িত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

এর আগে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ও ২ জানুয়ারি পুলিশের পাহারায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসভবনেও কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে এই চক্রটি প্রকাশ্যে গুলি চালিয়েছিল।

কে এই ডেভিড ইমন? পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোবারক হোসেন ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার এক সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান। লেখাপড়া না করা ইমন অল্প বয়সেই জড়িয়ে পড়েন কিশোর গ্যাংয়ের সাথে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে অপরাধ জগতে তার কোনো পরিচিতি ছিল না। তবে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’ গ্রুপে যোগ দিয়ে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে দ্রুতই সে বড় সাজ্জাদের নজরে আসে।

বর্তমানে ইমন এই বাহিনীর ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে কাজ করছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়ার জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ মাত্র দুই বছরেই সাতটি মামলার আসামি হয়েছে সে। অত্যন্ত দক্ষভাবে অস্ত্র চালাতে জানা ইমনের কাছে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। বর্তমানে দেশে এই চক্রটির নেতৃত্বে রয়েছে ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান (যার বিরুদ্ধে ৮টি মামলা রয়েছে)। বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, রাউজান ও হাটহাজারী এলাকায় এই চক্রের অর্ধশতাধিক শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে।

এর আগে গত ৯ মে বিপ্লব দে পার্থ নামের এক সাংবাদিকের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গুলি করার হুমকি দেয় ইমন। এছাড়া গত বছরের ২০ আগস্ট হাটহাজারীর ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীরের বাড়িতে এবং গত ২০ জুন চান্দগাঁওয়ের ‘ইয়ুনেস্কো’ পোশাক কারখানার সামনে প্রকাশ্যে ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এই বাহিনী।

কেন ধরতে পারছে না পুলিশ? চিহ্নিত এই শীর্ষ সন্ত্রাসী একের পর এক অপরাধ ঘটিয়ে চললেও পুলিশ তাকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ জানান, “মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন একজন পলাতক সন্ত্রাসী এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কলরেকর্ডটি সত্যি ডেভিড ইমনের কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। আত্মগোপনে থেকে সে পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ে অনেক কথাই বলতে পারে। তবে তাকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশের বিশেষ অভিযান ও তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।”

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য