Homeঅর্থনীতিপাল্টে যাচ্ছে অর্থবছর

জুলাই-জুনের বদলে জানুয়ারি-ডিসেম্বর সময় ধরে অর্থবছর চালুর প্রস্তুতি
পাল্টে যাচ্ছে অর্থবছর

দেশের প্রায় পাঁচ দশকের প্রচলিত জুলাই-জুন অর্থবছর পরিবর্তন করে জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ২০২৭ সালে ছয় মাসের একটি বিশেষ বা ট্রানজিশন বাজেট উপস্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার বৃদ্ধি এবং সরকারি অর্থের অপচয় কমানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশে অর্থবিভাগ অর্থবছর পরিবর্তনের সম্ভাব্যতা, প্রভাব এবং বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে একটি ধারণাপত্র (কনসেপ্ট পেপার) প্রস্তুত করছে। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত হলে আগামী বছর একটি সংক্ষিপ্ত মেয়াদের বাজেটের মাধ্যমে নতুন অর্থবছর কাঠামোয় রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে অর্থবছর শুরু হয় ১ জুলাই।

কিন্তু এ সময় দেশে বর্ষা মৌসুম চলমান থাকে। ভারি বৃষ্টি, বন্যা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সময়মতো শুরু করা সম্ভব হয় না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়, ব্যয় বেড়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে কাজের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অর্থবিভাগের এক অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘অর্থবছর পরিবর্তনের বিষয়টি নতুন নয়।

অতীতেও এ নিয়ে আলোচনা ও উদ্যোগ হয়েছিল। এবার বিষয়টি আবার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ দেওয়া হবে।’

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ এলাকায় শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করে। এ সময় উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণ ও বাস্তবায়ন কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর চালু হলে প্রকল্প পরিকল্পনা, দরপত্র আহবান এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে আরো বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

অর্থনীতিবিদদেরও একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে অর্থবছর পুননির্ধারণের পক্ষে মত দিয়ে আসছেন। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও প্রকল্প বাস্তবায়নের বাস্তবতা বিবেচনায় জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর অধিক কার্যকর হতে পারে। এতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়বে এবং সরকারি অর্থের অপচয় কমানো সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, অর্থবছরের শুরুতেই যদি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উপযোগী সময় পাওয়া যায়, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নে অযথা বিলম্ব কমবে। এতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রকল্পের গুণগত মানও উন্নত হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিলু্লর রহমানও অর্থবছর পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ ডিসেম্বর-জানুয়ারি সময়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থবছরও একই সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে সমন্বয় বাড়বে।

তিনি বলেন, ‘জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ভারি বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে অনেক উন্নয়নকাজ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের গতি কমে যায়। জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।’

বাংলাদেশে অর্থবছর পরিবর্তনের আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। ২০১৭ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও অর্থবছর জানুয়ারি-ডিসেম্বর করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন। সে সময় অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের অর্থবছর এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনামে ক্যালেন্ডার বছর এবং অর্থবছর একই জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর। পাকিস্তানে এখনো জুলাই-জুন অর্থবছর অনুসরণ করা হয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশেও চালু রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থবছর পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কেবল ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে রাজস্ব প্রশাসন, বাজেট প্রণয়ন, সরকারি হিসাব ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক প্রভাব বিশদভাবে মূল্যায়ন করা হবে।

তবে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, সরকার যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তাহলে ২০২৭ সাল হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রশাসনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের বছর। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর দেশের অর্থবছরের কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের মাধ্যমে উন্নয়ন ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো এবং বাজেট বাস্তবায়নে নতুন গতি আনার পথ খুলে যেতে পারে।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য