দেশজুড়ে মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। এর বেশির ভাগের বিরুদ্ধে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা না দেওয়া, রোগীদের দিনের পর দিন আটকে রাখা, মারধর ও নানা ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
কোথাও আবার রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে নানা অজুহাতে অর্থ আদায় এবং মাদক কেনার টাকা দিতে বাধ্য করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ক্যাচিং পার্টি’র মাধ্যমে কাউকে মাদকাসক্ত সাজিয়ে আটকে রাখার অভিযোগ। ফলে মাদকাসক্তি নিরাময়ের নামে কিছু প্রতিষ্ঠান যেন পরিণত হয়েছে গোপন কারাগারে।
যুগান্তরের অনুসন্ধানে রাজধানীর গুলশানে অভিজাত এলাকায় অবস্থিত একটি বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির নাম বীকন পয়েন্ট। গুলশান-২৩/এ সড়কের ছয়তলা ভবনটির প্রবেশপথে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। মাদকাসক্তির চিকিৎসার বিষয়ে জানতে গেলে নিরাপত্তাকর্মী সঙ্গে করে ভবনের দোতলায় নিয়ে যান। সেখানে কথিত কাউন্সেলরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্তত তিন মাসের চিকিৎসা নিতে হবে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে একজন বেসরকারি চাকরিজীবী ও গাঁজাসেবী পরিচয়ে প্রায় এক সপ্তাহ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে ২৫ জুলাই বিকেলে তিন সদস্যের অনুসন্ধানী দল সেখানে গেলে ভর্তির ফরম দেওয়া হয়।অগ্রিম দুই লাখ টাকা দিলে তাৎক্ষণিক ভর্তি করানোর কথা জানানো হয়। অথচ মাদকাসক্ত রোগী ভর্তির আগে ডোপ টেস্ট করার নিয়ম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
পরদিন সন্ধ্যায় অনুসন্ধানী দলের একজন রোগী সেজে সেখানে প্রবেশ করেন। দেহ তল্লাশির পর মোবাইল ফোন, কলম, ঘড়িসহ ব্যক্তিগত সামগ্রী জমা নেওয়া হয়। পরে তাঁকে ভবনের তৃতীয় তলার বিশেষ নিরাপত্তাবেষ্টিত ‘রেড জোনে’ নেওয়া হয়। সেখানে ঢোকার পর বাইরে থেকে দরজায় তালা দেওয়া হয়। চারপাশ পর্দা দিয়ে ঘেরা থাকায় আলো-বাতাস ও বাইরের শব্দ প্রবেশের সুযোগও ছিল সীমিত।
কিছুক্ষণ পর ২০-২৫ জন তরুণকে একটি ডাইনিং কক্ষে আনা হয়। তাঁদের বেশির ভাগই মাদকাসক্ত বলে জানানো হয়। অনুসন্ধানী দলের সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই কয়েক ধরনের ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল খেতে দেওয়া হয়। সেখানে থাকা কয়েকজন নতুন রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানতে চান, তাঁরা নিজের ইচ্ছায় এসেছেন, নাকি ‘ক্যাচিং’ করে আনা হয়েছে। ‘ক্যাচিং’ বলতে নিরাময়কেন্দ্রের লোকজনের মাধ্যমে কাউকে ধরে আনার বিষয়টি বোঝানো হয়।
সেখানে থাকা এক বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া যায় আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। তাঁর নাম মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ও শিল্পপতি। তাঁর ভাষ্য, মাদকাসক্তির সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। ২০২৪ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি একাকিত্ব কাটাতে নতুন করে সংসার করার ইচ্ছার কথা জানান। এতে ছেলে ক্ষুব্ধ হন। পরে এক রাতে তাঁকে বাসা থেকে তুলে এনে মাদকাসক্ত পরিচয়ে নিরাময়কেন্দ্রে রাখা হয়। তাঁর মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়।
শাহজাহানের দাবি, গুলশানে বাড়ি, গাজীপুরে খামার ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ তাঁর বিপুল সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাঁকে সেখানে আটকে রাখা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, টাকা দিলে মামলা বা পুলিশের ঝামেলা ছাড়াই কাউকে ধরে এনে নিরাময়কেন্দ্রে রাখা সম্ভব। এ কাজে কেন্দ্রগুলোর ‘ক্যাচিং পার্টি’ কাজ করে।
নিরাময়কেন্দ্রে থাকা ২১ বছর বয়সী এক তরুণও জানান, তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পর পরিবার ‘ক্যাচিং পার্টি’র মাধ্যমে তাঁকে ধরে আনিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের এক ব্যবসায়ী পরিবারের ওই তরুণ কলেজে পড়ার সময় ইয়াবায় আসক্ত হন। তাঁর দাবি, একপর্যায়ে ইয়াবার পাশাপাশি বিষধর সাপের ছোবল নিয়েও নেশা করতেন। ঢাকার টিএসসি এলাকায় একটি মাদকচক্রের কাছে গিয়ে প্রতিবার ১৫ হাজার টাকা দিয়ে সাপের ছোবল নিতেন বলেও জানান তিনি।
নিরাময়কেন্দ্রটিতে উচ্চশিক্ষিত ও বিত্তবান পরিবারের তরুণদেরও পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কোকেনে আসক্ত হওয়া এক তরুণ, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ঢাকার কার্যালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর এক শিক্ষার্থী রয়েছেন। ওই শিক্ষার্থীর দাবি, নিরাময়কেন্দ্রে আসার আগে প্রতিদিন ১৫টি পর্যন্ত ইয়াবা সেবন করতেন। এখানে আসার পর সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে তাঁর মানসিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ‘ক্যাচিং পার্টি’র মাধ্যমে কাউকে ধরে আনতে নিরাময়কেন্দ্রগুলোর বিভিন্ন প্যাকেজ রয়েছে। ঢাকার মধ্যে কাউকে ধরে আনার জন্য ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। ঢাকার বাইরে দূরত্ব অনুযায়ী খরচ বাড়ে। চট্টগ্রাম বা সিলেট থেকে কাউকে আনতে ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
বীকন পয়েন্টের কয়েকজন কর্মচারী জানান, মাদকাসক্তের পাশাপাশি মানসিক রোগী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্মার্টফোন ও মোবাইল গেমে আসক্তদেরও সেখানে রাখা হয়। তাঁদের জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা নেই। সবাইকে একই ভবনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
অভিযোগের বিষয়ে বীকন পয়েন্টের ম্যানেজার (অপারেশন) আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, মাদকাসক্তদের পাশাপাশি তাঁদের প্রতিষ্ঠানে মানসিক রোগীদেরও চিকিৎসা দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে মানসিক হাসপাতালের লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে। ভর্তি হওয়া প্রত্যেক রোগীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখার পর ব্যবস্থাপত্র দেন। মাদকাসক্ত বা মানসিক রোগী সাজিয়ে কাউকে আটকে রাখার সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে অনুসন্ধানে উঠে আসা অভিযোগগুলো বলছে, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির অভাবে মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রের আড়ালে কিছু প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার বদলে রোগী আটকে রাখা এবং অর্থ আদায়ের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে কার্যকর নজরদারি না থাকলে নিরাময়ের বদলে তা মানুষের জন্য ভয়ংকর বন্দিশালায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


