রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আগামীকাল বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনের অধিবেশনকক্ষে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সরাসরি গোপন ব্যালটে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
এ নির্বাচনে ভোটার চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৩৪৯ জন সদস্য। অনুপস্থিত কোনো সংসদ সদস্যের বিকল্প উপায়ে বা প্রক্সি ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। ভোটদানে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, “দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দিলে ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হয়ে যাবে।” তবে আইনজ্ঞদের মতে, এই দলীয় বাধ্যবাধকতা নির্দলীয় বা স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
এবার রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রার্থী দলটির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান অলি আহমদ। গত ১৬ আগস্ট যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচন কমিশন দুটি মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময় পার হলেও কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে ভোটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের নির্বাচন।
জোটের বাইরের ৯ ভোটে নজর সবার
সংসদের বর্তমান আসন বিন্যাস অনুযায়ী, বিএনপি ও তার মিত্রদের পক্ষে ভোটার সংখ্যা ২৪৭ জন। তবে ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাস বর্তমানে বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকায় বিএনপির মোট ভোটার দাঁড়াচ্ছে ২৪৬ জনে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিএনপির মিত্র তিন দল—গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) ৩টি ভোট।
অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের মোট ভোটার ৯০ জন। এর মধ্যে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জন, এনসিপির ৮ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ৩ জন, খেলাফত মজলিসের ১ জন এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) ১ জন সদস্য।
এই দুই বৃহৎ জোটের বাইরে অবস্থান করছেন ৯ জন সংসদ সদস্য। এদের মধ্যে রয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. ওলিউল্লাহ এবং ১টি সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট ৮ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য। স্বতন্ত্র সদস্যরা হলেন—এ জেড এম রেজওয়ানুল ইসলাম (দিনাজপুর-৫), মো. লুৎফর রহমান খান আজাদ (টাঙ্গাইল-৩), মোহাম্মদ সালমান ওমর (ময়মনসিংহ-১), শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল (কিশোরগঞ্জ-৫), রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২), আতিকুল আলম (কুমিল্লা-৭), মো. আব্দুল হান্নান (চাঁদপুর-৪) এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সুলতানা জেসমিন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সংবিধান অনুযায়ী স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। ফলে নির্বাচনে জয়ের সমীকরণ অনেকটা নিশ্চিত থাকলেও জোটের বাইরের এই ৯টি ভোট কোন প্রার্থীর বাক্সে পড়ে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়তি কৌতূহল দেখা দিয়েছে।
ইতিহাস ও নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি
এর আগে ১৯৯১ সালে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের পর তৎকালীন সংসদে প্রথমবার উন্মুক্ত ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল। সেবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে হারিয়ে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস নির্বাচিত হন। এরপরের প্রতিটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনই ছিল একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জানান, বহু বছর পর উন্মুক্ত ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়েছে। সাদা রঙের বিশেষ ব্যালট পেপারের মুড়ি অংশে সংসদ সদস্যের স্বাক্ষর নিয়ে তা প্রদান করা হবে। বিকেলের মধ্যেই সংসদ ভবনে প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণা শেষে গেজেট প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
উল্লেখ্য, সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর সংবিধান অনুযায়ী পদটি শূন্য হওয়ায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।


