বিদায় নিলেন মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দলনের অন্যতম নক্ষত্র নয়বার জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য এবং জাতির জনক শেখ মুজিবর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করা তোফায়েল আহমেদ। তিনি ছিলেন আওয়ামীলিগের উপদেষ্টা মন্ডলীর অন্যতম সদস্য। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন তিনি শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান এবং ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে পা রেখেছিলেন তরুণ তোফায়েল আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নেতা ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক পরিচিতি পান। এরপর মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন এবং দেশের রাজনীতির নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।
১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ২২ অক্টোবর ব্রিটিশ ভারতের বঙ্গ প্রদেশের বাকেরগঞ্জ জেলার কোড়ালিয়া গ্রামে (বর্তমান বাংলাদেশের ভোলা জেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নে ) তোফায়েল আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আজহার আলী এবং মাতা ফাতেমা বেগম।
১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে তিনি মাধ্যমিক, ১৯৬২ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে এমএসসি পাস করেন।
১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তোফায়েল আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ছিলেন। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে ছিলেন নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তোফায়েল আহমেদ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সকল আসামীকে মুক্তি প্রদান করে পাকিস্তান সরকার। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঐ বছরেরই ২৩শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবর রহমানের সম্মানে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে সভার আয়োজন করে। লাখো জনতার অংশগ্রহণে আয়োজিত এই সম্মেলনে শেখ মুজিবর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। উপাধি প্রদানের ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ।
১৯৭০ সালে তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব ছিলেন। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয় লাভ করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিব বাহিনীর অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের একজন ছিলেন। ১৯৭২ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিয়োগ পান।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সামরিক অভ্যুথান এবং শেখ মুজিবর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক প্রশাসন তোফায়েল আহমেদকে গ্রেপ্তার করে।তাঁর সহকারী ব্যক্তিগত সচিব মিন্টুকে জেল হেফাজতে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। সেই সময় তোফায়েল আহমেদ ৩৩ মাস জেলে ছিলেন।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে, তোফায়েল আহমেদকে বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০০৭ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারির পর তোফায়েল আহমেদ সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রস্তাবিত আওয়ামী লীগের সংস্কার পরিকল্পনার পক্ষে মত দেন, যেখানে দলীয় প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাকে অপসারণ করার প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তবে প্রেসিডিয়ামের প্রভাবশালী সদস্যদের একজন হওয়া সত্ত্বেও তোফায়েল আহমেদ মন্ত্রিসভা থেকে বাদ যান।
তোফায়েল আহমেদ জাতীয় সংসদের শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদেরও একজন সদস্য। তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসাবে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬,২০০৮ ও ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন তিনি শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালে মেটিকুলাস ডিজাইনে জঙ্গী হামলার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন সংসদ বিলুপ্ত করলে তিনি সংসদ সদস্য পদ হারান।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন। অবশেষে ২০২৬ সালের ১লা জুন সোমবার বেলা সাড়ে ৩টায় ঢাকার স্কয়ার হসপিটালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

