সারাদেশে গ্যাস সংকট স্বাভাবিক হতে আরও অন্তত দুই সপ্তাহ লাগতে পারে। এ সময়ের মধ্যে আবাসিক, শিল্প, যানবাহন ও বিদ্যুৎ খাতে ভোগান্তি বাড়তে পারে। পাশাপাশি লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গতকাল শনিবারও গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন আবাসিক গ্রাহকরা। দিনের অধিকাংশ সময় ঘরে ঘরে জ্বলেনি চুলা। রান্নার কাজ প্রায় বন্ধ ছিল।
মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) গত মঙ্গলবার আগুন লাগে। এতে টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। ওই দুর্ঘটনার পাঁচ দিন পার হলো গতকাল। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি।
দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দিয়ে বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে ৯০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট। মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে। প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট দৈনিক চাহিদার বিপরীতে ৩০ শতাংশ কম গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। এখন ঘাটতি বেড়ে চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
কবে ঠিক হবে?
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, শর্টসার্কিটের কারণে সৃষ্ট আগুনে টার্মিনালে গুরুত্বপূর্ণ বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ পুড়ে গেছে। এগুলো প্রতিস্থাপনের জন্য যুক্তরাজ্য থেকে তিনজন প্রকৌশলী আনা হয়েছে। তারা গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কেবল ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ মেরামত করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত টার্মিনাল চালুর তাগিদ দেওয়া হলেও এক্সিলারেট কর্তৃপক্ষ এখনও নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেনি।
সূত্রটির ভাষ্য, আগামী পাঁচ থেকে আট দিনের মধ্যে টার্মিনালটি আংশিক চালু করা সম্ভব হলে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা যাবে। তবে পুরো সক্ষমতায় চালু হতে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে।
সূত্রটি আরও জানায়, শুধু কারিগরি ত্রুটি মেরামতই নয়; আন্তর্জাতিক কোম্পানি হওয়ায় এক্সিলারেট এনার্জির ক্ষেত্রে ইন্স্যুরেন্সসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করতে হবে। এসব শেষ হওয়ার পরই টার্মিনালটি পুরোদমে চালু করা হবে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) রফিকুল ইসলাম বলেন, শর্টসার্কিটের কারণে কেবল পুড়ে গেছে। বিদেশি প্রকৌশলীরা মেরামতের কাজ করছেন। কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, যুক্তরাজ্যের প্রকৌশলীরা বিরামহীনভাবে কাজ করছেন। কিছু যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আনতে হতে পারে। দ্রুত চালুর জন্য এক্সিলারেট এনার্জিকে বলা হয়েছে। তবে তারা নির্দিষ্ট দিনক্ষণ জানাতে পারেনি।
ঘরে ঘরে রান্না বন্ধ প্রায়
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা, বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না। কোথাও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চাপ এতটাই কম থাকছে যে রান্না করাই সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ও ইন্ডাকশন কুকার ব্যবহার করছে। গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে কেউ কেউ পরদিনের জন্য রান্না সেরে রাখছেন।
মগবাজারের বাসিন্দা রোজিনা পারভীন বলেন, সকাল থেকে গ্যাসের চাপ এতটাই কম ছিল যে কিছুই রান্না করা সম্ভব হয়নি। রাত ৯টার পর গ্যাস এলেও শুধু ভাত রান্না করতেই প্রায় এক ঘণ্টা লেগেছে। আর কিছু রান্না করা সম্ভব হয়নি।
কাঁঠালবাগানের বাসিন্দা জেসমিন আক্তার বলেন, দুপুরে প্রায় এক ঘণ্টা চুলায় কড়াই বসিয়ে তেলও গরম করা যায়নি। ছোট শিশুর জন্য সময়মতো খাবার তৈরি করতে না পেরে প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে।
পাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি
সিএনজি স্টেশনগুলোতেও সংকট আরও তীব্র হয়েছে। রাজধানী থেকে জেলা শহর– সবখানেই গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক স্টেশন দিনের দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকছে। যেসব স্টেশন খোলা রয়েছে, সেখানে মধ্যরাত থেকেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।
ময়মনসিংহে গতকাল ভোরে কয়েকটি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ থাকলেও সকাল ১০টার পর অধিকাংশ স্টেশন বন্ধ হয়ে যায়। নরসিংদীতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চালকরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্যাসের চাপ কখনও শূন্যে নেমে যাওয়ায় দিনে একাধিকবার সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে।
সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর বলেন, একটি স্টেশন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য অন্তত ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। কিন্তু অনেক এলাকায় এখন ৪ থেকে ৫ পিএসআই, কোথাও আবার ২ পিএসআইরও কম চাপ পাওয়া যাচ্ছে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে গ্যাস বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
শিল্পে সংকট
গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতেও। অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে আনতে হয়েছে। কোথাও কোথাও বিকল্প হিসেবে ডিজেল ও এলপিজি ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহে জটিলতা দেখা দেবে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, তিতাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। টার্মিনালে ত্রুটির আগে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটে।
বাড়তে পারে লোডশেডিং
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক দিন সারাদেশে বৃষ্টি হওয়ায় এবং শুক্র ও শনিবার ছুটির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলক কম ছিল। তাই গ্যাস সরবরাহ কমলেও বড় ধরনের লোডশেডিং করতে হয়নি। তবে আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাপমাত্রা বাড়লে এবং শিল্পকারখানা পুরোপুরি চালু থাকলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। তখন লোডশেডিংও বাড়তে পারে।
গতকাল বিকেল ৫টায় দেশে লোডশেডিং ছিল ৮২১ মেগাওয়াট। তখন বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যা টার্মিনাল দুর্ঘটনার আগে ছিল গড়ে ৯০ কোটি ঘনফুট। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে প্রায় চার হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। আগে এসব কেন্দ্রে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো।
বাংলাদেশে ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি মহেশখালীতে দেশের প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালু করে। ১৫ বছরের চুক্তিতে দৈনিক ৬০ কোটি ঘনফুট সক্ষমতার এই টার্মিনাল পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। পরে ২০২০ সালে সামিট গ্রুপ একই এলাকায় দ্বিতীয় ভাসমান টার্মিনাল চালু করে, যার দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট।
তবে দুটি টার্মিনালের একটিতে সমস্যা দেখা দিলেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। চলতি বছর কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি টার্মিনালের কার্যক্রম অন্তত তিনবার ব্যাহত হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প উৎস বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্টরা।


