দীর্ঘ নিরবতার পর দেশে ফের উঁকি দিচ্ছে উগ্রবাদের পুরোনো আতঙ্ক। প্রায় দুই বছর ধরে উগ্রবাদী বা জঙ্গি তৎপরতার তেমন কোনো খবর না থাকলেও হঠাৎ করেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া বোমাতঙ্ক জনমনে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দেশের একের পর এক স্থানে উদ্ধার হচ্ছে বোমা বা বোমাসদৃশ বস্তু, কোথাও বা ঘটছে আচমকা বিস্ফোরণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উগ্রবাদের সরাসরি লক্ষণ অস্বীকার করলেও, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই আতঙ্ক ছড়াচ্ছে কি না, তা নিয়ে খোদ পুলিশ প্রশাসনের নীতি নির্ধারকেরাও চিন্তিত।
পুলিশ কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে কোনো তৃতীয় পক্ষ বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, উগ্রবাদের ঝুঁকিকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বোমা উদ্ধারের প্রতিটি ঘটনা গভীরভাবে তদন্ত করতে হবে এবং অকুস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি বিগত সরকারের আমলে উগ্রবাদী বা জঙ্গি হিসেবে কারাভোগ করে বর্তমানে জামিনে থাকা ব্যক্তিদের কঠোর নজরদারির আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
সম্প্রতি রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে সাভারে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার প্রসঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বরিশাল থেকে সাভার: একের পর এক বোমাতঙ্ক
গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় বরিশালের জেলা ও দায়রা জজ আদালত চত্বরে বিকট শব্দে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগে ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারে বড় ধরনের বোমাতঙ্ক ছড়ায়। পুলিশ জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার রাতে সাভারের তেঁতুলঝড়া এলাকায় গোপন আস্তানায় অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’র সক্রিয় সদস্য আরিফকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন সকালে সেখান থেকে অদূরে বনগাঁও ইউনিয়নের গোপেরবাড়ী এলাকায় একটি মাঠের ভেতর প্রেশার কুকারে রাখা বোমাসদৃশ বস্তুর সন্ধান পায় পুলিশ। পরে বিকেলে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট তা নিষ্ক্রিয় করে।
পাশাপাশি দুটি স্থানে বোমা ও আস্তানার সন্ধান পাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এর আগে গত ৩১ জুলাই আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে রাখা ব্যাগ থেকে এবং রাজধানীর মতিঝিলে মেট্রো রেল স্টেশনের নিচ থেকে একই ধরনের প্রেশার কুকার বোমা উদ্ধার করা হয়েছিল। তা ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সারাদেশে বোমা হামলার গুজবের তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করার চেষ্টা চালানো হয়।
উগ্রবাদের যোগসূত্র ও পুলিশের অভিযান
ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, সাভারে গ্রেপ্তার হওয়া আরিফকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আরিফের সঙ্গে নব্য জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের যোগাযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জেএমবির বোমারু হিসেবে পরিচিত ‘বোমারু মামুন’ ওই আস্তানায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন এবং বোমা তৈরির কাজ তদারকি করতেন বলে তথ্য মিলেছে।
সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন জানিয়েছেন, মতিঝিল ও আশুলিয়ায় বোমা রাখার ঘটনায় দুজনকে শনাক্ত করা গেছে, যাদের একজন আরিফ এবং অপরজন পলাতক বোমারু মামুন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার আরিফকে দীর্ঘদিন ধরে কিশোরগঞ্জ থেকে অনুসরণ করছিলেন গোয়েন্দারা। পরে সাভারের হেমায়েতপুরে বাস থেকে নামার পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন তার ব্যাগ থেকে পাঁচটি হাতবোমা, ছুরি ও বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যে শ্যামপুরের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরও ৯টি ককটেলসহ বিপুল পরিমাণ গানপাউডার উদ্ধার করা হয়। সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম জানান, প্রাথমিক তদন্তে এটি জেএমবির কাজ বলেই নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং ওই বাড়ি থেকে সংগঠনটির উগ্রবাদী লিফলেটও উদ্ধার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতামত ও সতর্কবার্তা
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরী মনে করেন, তদন্তের ক্ষেত্রে তিনটি দিক গুরুত্ব দিতে হবে—একক জঙ্গি সংগঠন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং ব্যক্তিগত কারণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সাবেক জঙ্গি সদস্য ও তালিকাভুক্ত উগ্রবাদীদের প্রতিটি গতিবিধি কড়া নজরদারিতে রাখা এখন সময়ের দাবি।
অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) মিডিয়া বিভাগের সুপার মাহফুজুল আলম রাসেল জানিয়েছেন, অনলাইনে উগ্রবাদী প্রচার-প্রচারণা নজরদারির পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে তাদের গোপন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সাভারের ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারেও উল্লেখ করা হয়েছে, আরিফ ও তার সহযোগীরা দেশকে অস্থিতিশীল করতে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার লক্ষ্য নিয়েই এই নাশকতার পরিকল্পনা করছিল।


