Homeখেলাআর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড: ফুটবল ছাড়িয়ে যুদ্ধ আর প্রতিশোধ

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড: ফুটবল ছাড়িয়ে যুদ্ধ আর প্রতিশোধ

ফুটবল দুনিয়ায় আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই রক্তক্ষয়ী ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি, টানটান উত্তেজনা, বিতর্ক আর ইতিহাস। ১৯৬৬ সালে আন্তোনিও রাতিন, ১৯৮৬ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনা কিংবা ১৯৯৮ সালে ডেভিড বেকহ্যাম—এই দুই দলের লড়াই বরাবরই ফুটবল রূপকথার অংশ হয়ে থেকেছে।

এবার দীর্ঘ ২৫ বছর পর আবারও বিশ্বকাপে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই দুই পরাশক্তি, প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে লড়ছে তারা। ফাইনালে ওঠার এই লড়াইকে ঘিরে দুই দেশের ফুটবলপ্রেমীদের মনে পুরোনো সব স্মৃতি আর আবেগ নতুন করে জেগে উঠেছে।

সেই আবেগ আর স্মৃতির কথা তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে।

মাঠের লড়াইয়ে তিক্ততার শুরু

আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের এই ফুটবলীয় শত্রুতার ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের মাটিতে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে লাল কার্ড দিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয়। ক্ষুব্ধ রাতিন মাঠ ছাড়ার সময় ব্রিটিশ পতাকাসংবলিত কর্নার ফ্ল্যাগ চেপে ধরেন এবং রানী এলিজাবেথের জন্য রাখা লাল গালিচায় বসে পড়ে মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। পরে তিনি অভিযোগ করেন, ইংলিশ দর্শকরা তার দিকে বিয়ারের ক্যান ছুড়ে মেরেছিল। ম্যাচটি ইংল্যান্ড ১-০ গোলে জেতে এবং পরে চ্যাম্পিয়ন হয়।

তবে ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের “পশু” বলে গালি দিয়েছিলেন, যা আর্জেন্টাইনরা আজও ভোলেনি।

ম্যারাডোনা ও ‘ঈশ্বরের হাত’

এর ঠিক ২০ বছর পর, ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে আবারও দুই দল কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়। এর মাত্র চার বছর আগে ১৯৮২ সালে ফকল্যান্ডস (আর্জেন্টাইনদের কাছে ‘মালভিনাস’) দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল। এ যুদ্ধে নিহত হয় ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন আর ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা। ফলে ১৯৮৬ সালের ফুটবল মাঠের লড়াইটি আর কেবল খেলা ছিল না, এটি রূপ নিয়েছিল জাতীয় সম্মানের লড়াইয়ে।

সেই ম্যাচে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম জাদুকর আর্জেন্টিনার মহানায়ক ডিয়েগো ম্যারাডোনা একাই দুই গোল করে ইংল্যান্ডকে বিদায় করে দেন। তার দ্বিতীয় গোলটি ছিল মাঝমাঠ থেকে একক নৈপুণ্যে ইংল্যান্ডের পুরো দলের অর্ধেক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে করা শতাব্দীর সেরা গোল। তবে প্রথম গোলটি তিনি করেছিলেন হাত দিয়ে, যা পরে “হ্যান্ড অব গড” বা “ঈশ্বরের হাত” গোল নামে পরিচিতি পায়। বর্তমানের ভিএআর প্রযুক্তির যুগে এই গোলটি নিশ্চিতভাবেই বাতিল হয়ে যেত।

কিন্তু ম্যারাডোনা ও আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে এটি কোনো প্রতারণা ছিল না। এটি ছিল যুদ্ধে হেরে যাওয়া একটি দুর্বল দেশের পক্ষ থেকে ফুটবল মাঠে এক পরাশক্তিকে হারিয়ে দেওয়ার মধুর প্রতিশোধ। এমনকি ডিয়েগো ম্যারাডোনাও তার আত্মজীবনীতে সেই ম্যাচে জয়ের কথা বলতে গিয়ে স্মরণ করেছেন ফকল্যান্ডস যুদ্ধে প্রাণ দেওয়া আর্জেন্টাইন তরুণ যোদ্ধাদের কথা।

সংস্কৃতির আদান-প্রদান ও চাপা ক্ষোভ

দুই দেশের এই সম্পর্কের পেছনে ভালোবাসা আর ঘৃণার এক অদ্ভুত রসায়ন রয়েছে। ১৯ শতকে ব্রিটিশ রেলওয়ে শ্রমিকরাই মূলত আর্জেন্টিনায় ফুটবল খেলা নিয়ে এসেছিলেন। আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ক্লাব রিভার প্লেট কিংবা লিওনেল মেসির ছোটবেলার ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের ইংরেজি নামগুলো তারই প্রমাণ।

তবে ব্রিটিশদের প্রথাগত নিয়মতান্ত্রিক ফুটবলের বাইরে গিয়ে আর্জেন্টিনার ফুটবল বিকশিত হয়েছে গলিতে আর ধুলোবালি মাখা স্থানীয় মাঠে। ফলে প্রথম থেকেই তাদের খেলায় ব্রিটিশদের মতো শুধু শারীরিক শক্তি বা নিয়মের কড়াকড়ি ছিল না; বরং ছিল চাতুর্য ও নান্দনিক ড্রিবলিং। ১৯ শতকে ব্রিটিশরা আর্জেন্টিনার ব্যাংকিং, রেলপথ ও ব্যবসায় একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই আধা-ঔপনিবেশিক আচরণের কারণে আর্জেন্টিনার মানুষের মনে ব্রিটিশদের প্রতি সব সময়ই একটি চাপা ক্ষোভ ছিল।

পরবর্তী লড়াই ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

১৯৮৬ সালের পর ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে দুই দলের ম্যাচটি স্মরণীয় হয়ে আছে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড পাওয়ার জন্য। সেই ম্যাচে টাইব্রেকারে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। এর চার বছর পর ২০০২ সালের বিশ্বকাপে বেকহ্যামের একমাত্র গোলে জয় পায় ইংল্যান্ড। সেটিই ছিল বিশ্বকাপে এই দুই দলের শেষ দেখা।

বর্তমানে ইংল্যান্ড বা আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়রা এই ঐতিহাসিক বৈরিতা নিয়ে প্রকাশ্যে তেমন কোনো মন্তব্য করছেন না। আর্জেন্টিনার অনেক ফুটবলার এখন ইউরোপের লিগগুলোতে খেলেন, যার ফলে মাঠের বাইরের পুরোনো তিক্ততা কিছুটা হলেও কমে এসেছে। সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার পর আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এটি স্রেফ একটি ফুটবল ম্যাচ, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়।’

তবে খেলোয়াড়দের মুখে যাই থাকুক, মাঠের ভেতরের আবেগ কিন্তু ভিন্ন কথা বলে। সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর মাঠের খেলোয়াড়রা দর্শকদের সাথে লাফিয়ে লাফিয়ে গান ধরেছিলেন, যার অর্থ ছিল—‘যে লাফাবে না, সে-ই ইংলিশ!’

এমনকি ড্রেসিংরুমে ফিরে খেলোয়াড়দের গাওয়া গানের ভিডিওতে দেখা গেছে, তারা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ম্যারাডোনাকে অন্যায়ভাবে বাদ দেওয়ার এবং ফকল্যান্ডস যুদ্ধে নিহতদের স্মরণে এই ম্যাচটি জিতে ডিয়েগো ও মেসির জন্য প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করছেন।

আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি পল পরিষ্কার করেই বলেছেন, ‘ম্যাচটির সাথে ডিয়েগোর স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তাই এর গুরুত্ব অনেক। তবে সবকিছুর ওপরে, আমরা এই ম্যাচটি জিতে ফাইনালে যেতে চাই।’

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য