বাংলাদেশিদের জন্য দুই বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে পুনরায় চালু হচ্ছে ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টার অংশ হিসেবে আগামী রোববার থেকে এই ভিসা কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। তবে এবার ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে ওটিপি ও ডকুমেন্ট স্বয়ংক্রিয় ভেরিফিকেশনের কঠোর নতুন নিয়ম।
কর্তৃপক্ষ আবেদনকারীদের দালাল বা অননুমোদিত এজেন্টের মাধ্যমে আবেদন না করে সরাসরি ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারের (আইভ্যাক) মাধ্যমে আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছে। আবেদনপত্রের পিডিএফ ফাইল ৩০ দিনের বেশি পুরোনো বা সম্পাদিত হলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট সহিংসতা এবং পরবর্তী সময়ে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। সে সময় ধানমন্ডিতে ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র লুণ্ঠিত ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন শহরে অন্তত পাঁচটি আইভ্যাক হামলার মুখে পড়ে এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত ভারতীয় কর্মকর্তারাও হুমকির সম্মুখীন হন।
নিরাপত্তাজনিত এই গুরুতর হুমকি এবং হাইকমিশনের স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোর ওপর হামলার কারণে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশন ভিসা কার্যক্রম সীমিত করতে বাধ্য হয়। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই থেকে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রগুলো প্রথমে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে দৈনিক ঘোষণার ভিত্তিতে ট্যুরিস্ট ভিসা বন্ধই রাখা হয়।
আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে সীমিত পরিসরে ভিসা আবেদন কেন্দ্র খুলে দেওয়া হলেও কেবল জরুরি ও মেডিকেল ভিসা ইস্যু করা হচ্ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে ভারতীয় ভিসাপ্রত্যাশী বাংলাদেশিরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। ব্যবসার কাজে অনেকে বিদেশে যেতে পারছিলেন না, আবার মেডিকেল ভিসা সীমিত পরিসরে চালু থাকলেও সাধারণ মানুষ ভিসা আবেদন জমা দেওয়ার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাচ্ছিলেন না।
মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে এই অচলাবস্থা আর কাটেনি। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে খবর আসে, ভারত শিগগির বাংলাদেশিদের জন্য আবার ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করতে যাচ্ছে।
তারও দেড় মাস পর গত এপ্রিলে ভারত সরকার প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত করে দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে নতুন হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। দুই দেশের ৫৫ বছরের সম্পর্কের ইতিহাসে ভারত এই প্রথম কোনো রাজনীতিবিদকে দেশটির হাইকমিশনার করে বাংলাদেশে পাঠাল।
গত ১২ জুন বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সড়কপথে বাংলাদেশে আসেন ত্রিবেদী। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে পরিচয়পত্র পেশের মধ্য দিয়ে ঢাকা মিশনের দায়িত্ব শুরু করেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তিনি সরাসরি যমুনা ফিউচার পার্কের ভারতীয় ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারে আসেন এবং ভিসার জন্য আগতদের সঙ্গে কথা বলেন।
এরপর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আগামী রোববার থেকে ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালুর ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। হাইকমিশনার বলেন, ‘১২ জুন যখন বেনাপোল হয়ে বাংলাদেশে এলাম, তখন সাংবাদিকরা শুরুতে আমাকে ভিসা নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। ওই জিনিসটা আমার মাথায় ছিল। আর মাথায় ঢুকল যে, ভিসা সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট। দায়িত্বের প্রথম দিনই এই ঘোষণা দিতে পেরে আমি অনেক খুশি। এটা আমাদের জন্য ভালো, এখানকার মানুষের জন্য ভালো। এটা সবার পাওনা ছিল।’
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনায় ভারতীয় ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারের মাধ্যমে এই আবেদন নেওয়া হবে এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শহরেও এই কার্যক্রম চালু হবে। তবে মানবিক বিবেচনায় জরুরি ক্ষেত্রে মেডিকেল ভিসার সুবিধাটি আগের মতোই অব্যাহত থাকবে।
কীভাবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করবেন
নতুন নিয়মে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য কমাতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেমে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগ্রহীদের প্রথমে ভারতীয় ভিসার অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে (https://indianvisabangladesh.nic.in/visa/Registration) গিয়ে ফর্ম সঠিকভাবে পূরণ করে ডাউনলোড করতে হবে। এরপর নিচের নিয়ম অনুযায়ী অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট বুক করতে হবে:
আগের দিন বুকিং: আপনি যেদিন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেবেন, তার ঠিক আগের দিন অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট বুক করতে হবে। পরবর্তী কার্যদিবসের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট পূর্ববর্তী কার্যদিবসে প্রকাশ করা হয়।
নির্দিষ্ট সময়সীমা: দুপুর ২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত আইভ্যাকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট সাইটে (https://appointment.ivacbd.com/) প্রবেশ করে সাইন-আপ এবং ওয়েবফাইল আপলোড করা যাবে। বিকাল সাড়ে ৪টার আগে সাইন-আপ না করলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করা যাবে না।
একই দিন বিকাল ৫টায় বুকিং: শুধু যেসব আবেদনকারী ঠিকভাবে তাদের ওয়েবফাইল আপলোড করেছেন, তাদের জন্য একই দিন বিকাল ৫টা থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং শুরু হবে। বুকিংয়ের জন্য সাইটে থাকা ‘সাইন-আপ’ বাটনে ক্লিক করে ভিসার ওয়েব ফাইলে থাকা ইমেল অ্যাড্রেস দিতে হবে।
দ্বিমুখী ওটিপি ভেরিফিকেশন: সাইন-আপ করার পর একটি ওটিপি মোবাইলে এসএমএস করে পাঠানো হবে এবং আরেকটি যাবে ইমেলে। প্রথমে ইমেলের ওটিপি এবং পরবর্তী সময়ে মোবাইল এসএমএসের ওটিপি সাবমিট করার মাধ্যমে ইমেল এবং মোবাইল নম্বর ভেরিফিকেশন করতে হবে। এরপর ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে সাইন-আপ করতে হবে।
ডকুমেন্ট আপলোড: সাইন-আপ শেষ হলে মোবাইল নম্বর এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করতে হবে। লগইন করার পর পুনরায় মোবাইলে ওটিপি পাঠানো হবে। ওটিপি দিয়ে প্রবেশ করলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাতা চলে আসবে। সেখানে প্রথমে ডকুমেন্টগুলো আপলোড করতে হবে। ডকুমেন্টগুলো থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্যসমূহ যুক্ত হবে। আপলোড করা ওয়েবফাইল অবশ্যই মূল ভিসা আবেদনপত্রের পিডিএফ হতে হবে এবং ৩০ দিনের বেশি পুরোনো হওয়া চলবে না। পরিবর্তিত, সম্পাদিত বা বিকৃত ফাইল সরাসরি বাতিল করা হবে।
সন্ধ্যা ৬টার স্লট বুকিং: আপলোড করার পর অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট খোলা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সন্ধ্যা ৬টায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট চালু হলে পুনরায় লগইন করতে হবে। লগইন করার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরবর্তী দিনের জন্য নির্বাচিত একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট দেখাবে। সেটি পরিবর্তন করতে চাইলে মাত্র একবার বদলানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। স্লট বুক হওয়ার পর অনলাইনে ভিসা প্রসেসিং ফি পেমেন্ট করতে হবে।
ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য কী কী কাগজপত্র লাগবে
আবেদনপত্র জমা দেওয়ার সময় নিচে উল্লেখিত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো অবশ্যই সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে, এগুলো ছাড়া আবেদন অসম্পূর্ণ বলে গণ্য হবে:
১. মূল পাসপোর্ট ও ফটোকপি: ভিসা আবেদন জমা দেওয়ার সময় কমপক্ষে ৬ মাস মেয়াদসহ মূল পাসপোর্ট (কমপক্ষে দুইটি খালি পৃষ্ঠা থাকতে হবে) দিতে হবে। পাসপোর্টের ফটোকপি (প্রথম ৪ পাতা এবং মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন যদি থাকে) সঙ্গে দিতে হবে। আবেদন জমা দেওয়ার সঙ্গে পুরোনো সব পাসপোর্ট জমা দিতে হবে।
২. ছবি: পূর্ণ মুখমণ্ডল দেখা যায় এমন সাম্প্রতিক তোলা (৩ মাসের অধিক পুরোনো নয়) পাসপোর্ট সাইজ (২x২) রঙিন ছবি। অনলাইন ভিসা আবেদনপত্রের প্রদত্ত জায়গায় আবেদনকারীর ছবি স্ক্যান করে আপলোড করতে হবে।
৩. জন্ম তারিখের প্রমাণ: জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন সনদের কপি।
৪. আবাসন প্রমাণ: ইউটিলিটি বিল যেমন ইলেকট্রিসিটি, টেলিফোন, গ্যাস বা পানির বিল (ছয় মাসের অধিক পুরোনো নয়)।
৫. পেশার প্রমাণ: যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন সেখানকার নিয়োগকর্তার পত্র। ছাত্রদের ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র এবং ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স লাগবে।
৬. আর্থিক স্বচ্ছতার প্রমাণ: প্রতিটি আবেদনপত্রের সঙ্গে ১৫০ ডলার সমমূল্যের বিদেশি মুদ্রা এনডোর্স বা আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের কপি বা পর্যাপ্ত ব্যালান্স দেখানোর প্রয়োজনে হালনাগাদ ব্যাংক স্টেটমেন্ট।
৭. অনলাইন আবেদনপত্র: রেজিস্ট্রেশন নম্বরসহ অনলাইন ভিসা আবেদনপত্র।
ভিসা ফি ও পাসপোর্ট ফেরত
ভারত সরকার ভিসার জন্য কোনো ফি নেয় না। তবে সব ধরনের ভিসা প্রক্রিয়াকরণের জন্য আইভ্যাক ১ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে থাকে। এই ফি অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং করার সময় অনলাইনেই পেমেন্ট করতে হয়।
ভিসা প্রক্রিয়াকরণ হয়ে গেলে আবেদনের সঙ্গে দেওয়া মোবাইল নম্বরে একটি এসএমএস দিয়ে জানানো হবে। এরপর আপনাকে নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে সশরীরে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হবে।


