ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস আর কখনোই বসবাসের উদ্দেশ্যে বাকিংহাম প্যালেসে ফিরবেন না বলে নিশ্চিত করেছেন রাজপরিবারের কর্মকর্তারা। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার তারা জানান, ব্রিটিশ রাজপ্রাসাদে সংস্কারকাজ চলমান থাকায় প্রায় ১০ বছর আগে সেখান থেকে সরে আসেন রাজা চার্লস ও তার পরিবার।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, এই সংস্কারকাজ আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও রাজা চার্লস ও রানী ক্যামিলা বসবাসের উদ্দেশ্যে আর সেখানে ফিরতে চান না। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে লন্ডনের কেন্দ্রস্থলের এই ঐতিহাসিক প্রাসাদ ব্রিটিশ সম্রাটের ‘প্রধান বাসভবন’ হিসেবে ব্যবহারের ধারার অবসান ঘটতে চলেছে।
রাজা তৃতীয় চার্লস সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আগামী বছর ৩৬ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড ব্যয়ে বাকিংহাম প্যালেসের চলমান সংস্কারকাজ শেষ হলেও তিনি তার দীর্ঘদিনের লন্ডনের বাসভবন ক্ল্যারেন্স হাউসেই থাকবেন। সংস্কার প্রকল্পের আওতায় পুরোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ, পাইপলাইন ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা পরিবর্তন করা হচ্ছে।
২০১৭ সালে প্রাসাদের সংস্কারকাজ শুরু হওয়ার সময় কর্মকর্তারা ধারণা করেছিলেন, ১৮৩৭ সালে রানি ভিক্টোরিয়া সিংহাসনে আরোহণের পর থেকে যেভাবে বাকিংহাম প্রাসাদ ব্রিটিশ সম্রাটের প্রধান বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, সেই ধারাই বজায় থাকবে। তবে রাজা চার্লস সেখানে না ফিরলে তার উত্তরসূরিরাও হয়তো আর এই প্রাসাদে ফিরতে পারবেন না।
রাজার কোষাধ্যক্ষ ও প্রিভি পার্সের রক্ষক জেমস চালমার্স বলেন, ‘প্রাসাদটি বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও অতিথিদের অভ্যর্থনাসহ সব ধরনের রাষ্ট্রীয় ও আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র হিসেবেই থাকবে।’
‘এটি এখন যেমন রাজতন্ত্রের প্রধান কেন্দ্র, ভবিষ্যতেও তেমনই থাকবে। এটি আমাদের জাতীয় স্থাপনাগুলোর মুকুটমণি। রাজা যখন লন্ডনে অবস্থান করবেন, প্রাসাদের ছাদে তার রাজকীয় পতাকা ওড়ানো হবে’, যোগ করেন তিনি।
২০১৯ সালের পর থেকে রাজা তৃতীয় চার্লস কিংবা প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ কেউই বাকিংহাম প্রাসাদে রাতযাপন করেননি। তবে রাজা সেখানে ব্যক্তিগত কিছু কক্ষ সংরক্ষণ করবেন, যা প্রয়োজনে আবাসন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
জেমস চালমার্স জানান, প্রতি বছর প্রায় সাত লাখ মানুষ বাকিংহাম প্রাসাদ পরিদর্শনে আসেন। সংস্কার শেষ হলে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার আরও বাড়ানো হবে। তবে সংরক্ষিত কক্ষগুলোতে দর্শনার্থীর প্রবেশাধিকারের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
এদিকে রাজপরিবারের কর্মকর্তারা প্রথমবারের মতো রাজার দেওয়া আয়কর নথি প্রকাশ করেছেন। সে হিসেবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজা তৃতীয় চার্লস এক কোটি ২৯ লাখ পাউন্ড কর দিয়েছেন, যা প্রায় ১৭ কোটি চার লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। এই অঙ্ক তাকে ব্রিটেনের সর্বোচ্চ একশ করদাতার একজনের কাতারে নিয়ে গেছে।

২০২২ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর রাজপরিবারের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকায় সদস্যরা তাদের অর্থনৈতিক বিষয়ে আরও স্বচ্ছতা প্রদর্শনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আইন অনুযায়ী ব্রিটিশ রাজাকে আয়কর, মূলধনী মুনাফা কর কিংবা উত্তরাধিকার কর দিতে বাধ্য করা যায় না। তবে ১৯৯৩ সাল থেকে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ যেভাবে স্বেচ্ছায় কর দিয়ে আসছিলেন, রাজা তৃতীয় চার্লসও একইভাবে স্বেচ্ছায় কর দিচ্ছেন। তবে এতদিন তিনি করের পরিমাণ প্রকাশ করেননি।
১৩৯৯ সাল থেকে সব ব্রিটিশ সম্রাটের মতো রাজা তৃতীয় চার্লসও ল্যাঙ্কাস্টার ডাচি এস্টেট থেকে ব্যক্তিগত আয় পান। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেখান থেকে তার আয় হবে দুই কোটি ৫২ লাখ পাউন্ড। এ ছাড়া তার অন্য সম্পদ ও বিনিয়োগ থেকেও আয় রয়েছে।
জেমস চালমার্স জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজা এক কোটি ১৭ লাখ পাউন্ড কর দিয়েছেন। ২০২২ সালে সিংহাসনে আরোহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি মোট তিন কোটির বেশি পাউন্ড কর পরিশোধ করেছেন।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পদ ছাড়াও রাজা ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকেও একটি অনুদান পান, যা সার্বভৌম অনুদান নামে পরিচিত। এই অর্থ রাজকীয় কর্মচারীদের বেতন, রাজপ্রাসাদগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং সফরের ব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই অনুদানের পরিমাণ হবে ১৩ কোটি ৭৯ লাখ পাউন্ড।
তবে জেমস চালমার্স বলেন, ‘রাজার সুস্পষ্ট ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে প্রথমবারের মতো এই অনুদান কমিয়ে ১০ কোটি পাউন্ড করা হবে। ২০৩১-৩২ অর্থবছর পর্যন্ত এই পরিমাণই বহাল থাকবে।’

২০১৬ সালে বাকিংহাম প্রাসাদের সংস্কার ব্যয় মেটাতে যে পরিমাণ অনুদান দেওয়া হয়েছিল, রাজার বর্তমান বরাদ্দ সে তুলনায় প্রায় ছয় কোটি পাউন্ড বেশি। চালমার্স বলেন, ‘এটি কোনো উন্মুক্ত অর্থের চেক নয়। অর্থের পরিমাণ যৌক্তিক রাখতে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।’
কেবল রাজা তৃতীয় চার্লসই নন, সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়াম ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৭ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড কর দিয়েছেন। তার কার্যালয় জানিয়েছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি কারাগার থেকে পাওয়া ১৫ লাখ পাউন্ড ভাড়ার অর্থ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
তবে রাজা তৃতীয় চার্লস ও প্রিন্স উইলিয়াম দুজনই তাদের সম্পদ ব্রিটিশ সেনাবাহিনী, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ ভাড়া দিয়ে সেখান থেকে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছেন- এমন অভিযোগে কড়া সমালোচনারও সম্মুখীন হয়েছেন।


