জাতীয় পরিসংখ্যানের ওপর জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং তথ্য-উপাত্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এখন থেকে সরকারি তথ্যের আড়ালে কোনো লুকোচুরি থাকবে না; বরং গবেষক, শিক্ষাবিদ ও নীতিপ্রণেতাদের জন্য জাতীয় পরিসংখ্যানগত সব ডেটা আরও সহজ ও উন্মুক্ত করা হচ্ছে। গতকাল ঢাকার শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নবপ্রতিষ্ঠিত ‘মাইক্রো ডেটা অ্যানালাইসিস ল্যাব’-সংক্রান্ত কর্মশালায় সরকারের এই বড় সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে দারিদ্র্যের হার, জনসংখ্যা, আয়ের পরিসংখ্যানসহ বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের নির্ভুলতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছিল। ফলে সরকারি তথ্যের ওপর জনসাধারণের এক ধরনের গভীর সংশয় ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার তথ্য সংগ্রহ এবং তা প্রকাশের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে অতীতের মতো তথ্য নিয়ে কোনো লুকোচুরির সুযোগ না থাকে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের প্রকৃত অগ্রগতি পরিমাপ, যেকোনো পলিসির কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যের কোনো বিকল্প নেই। সরকার তথ্যের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ খোলামেলা নীতিতে বিশ্বাসী। গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নয়ন সহযোগী এবং দেশের সাধারণ নাগরিকরা যেন দেশের বাস্তব পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। সঠিক বেসলাইন তথ্য না থাকলে সরকারের কোনো উন্নয়ন প্রকল্প মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করছে কি না, কিংবা দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সফল হচ্ছে কি না তা সঠিকভাবে পরিমাপ করা অসম্ভব।
কোরিয়ান সংস্থা কোইকার সহায়তায় পরিচালিত ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অব স্ট্যাটিস্টিকস সার্ভিস বেসড্ অন প্ল্যাটফর্ম’ প্রকল্পের আওতায় এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নবপ্রতিষ্ঠিত এ মাইক্রো ডেটা অ্যানালাইসিস ল্যাবের মাধ্যমে অনুমোদিত ব্যবহারকারীরা একটি নিরাপদ পরিবেশে সম্পূর্ণ শুমারি এবং জরিপের মাইক্রো ডেটা ব্যবহারের সুযোগ পাবেন, যা আগে কেবল সীমিত আকারে প্রকাশ করা হতো।
বিবিএস সূত্রে জানা গেছে, তথ্যের ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষাকে এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। গবেষকরা ল্যাবে এসে সরাসরি তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবেন, তবে কোনো মূল বা কাঁচা ডেটা ল্যাবের বাইরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না। ল্যাবের একটি বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি কর্তৃক যাচাইবাছাইয়ের পর কেবল টেবিল, গ্রাফ ও বিশ্লেষণাত্মক ফলাফলগুলোই গবেষকদের দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকার এ গবেষণাগারটিকে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান পরিষেবাকে আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন। বিবিএসের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘এ সুবিধাটি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও নীতিপ্রণেতাদের জন্য সরকারি ডেটা ব্যবহারের একটি নিরাপদ ও সুশাসিত কাঠামো তৈরি করবে। কোইকা বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর জিহুন কিম জানান, বিবিএসের সঙ্গে তাঁদের এ যৌথ প্রয়াস দেশের পরিসংখ্যানগত অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে রূপান্তর করতে সাহায্য করছে। কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে বিবিএস মাইক্রো ডেটা ক্যাটালগ, অনলাইন আবেদন সুবিধাসহ আরও কিছু আধুনিক সেবা চালু করবে।


