অর্থনীতির ওপর ভবিষ্যৎ চাপ মোকাবিলা এবং সংস্কার কর্মসূচিকে নতুন কাঠামোয় এগিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন ঋণ সহায়তা চাইছে সরকার। এ লক্ষ্যে তিন বছর মেয়াদি একটি নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চলতি মাসের শুরুতে আইএমএফের কাছে এ বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আবেদনে ঋণের নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ না থাকলেও আলোচনায় ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলারের একটি সম্ভাব্য অঙ্ক বিবেচনায় রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কত অর্থ পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে আইএমএফের মূল্যায়ন ও নির্বাহী পর্ষদের সিদ্ধান্তের ওপর।
বাংলাদেশ এর আগে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময় আইএমএফের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ সহায়তা নিয়েছিল। সেই কর্মসূচির আওতায় কয়েকটি কিস্তিতে অর্থ ছাড় হলেও শেষ ধাপের অর্থ পাওয়া যায়নি। কারণ হিসেবে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণে জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়। ফলে নতুন সরকার এখন পরিবর্তিত বাস্তবতায় একটি নতুন সমঝোতার পথ খুঁজছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে থাকলেও এর বড় অংশ এসেছে আমদানি ব্যয় কমে যাওয়ার কারণে। ভবিষ্যতে আমদানি ও উন্নয়ন ব্যয় বাড়লে আবারও রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়ন এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দিতেও সরকারের অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, আগের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদনের সময়কার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এখন আর বিদ্যমান নেই। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ এবং নীতিগত পরিবর্তনের কারণে কিছু সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে সরকার সংস্কার থেকে সরে আসতে চায় না; বরং দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে এগোতে চায়।
এদিকে অর্থনীতির বেশ কয়েকটি সূচক এখনও উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক পতন, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং সরকারি ঋণের বোঝা বৃদ্ধি নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরেরও কম সময়ে দেশের মোট সরকারি ঋণ কয়েক লাখ কোটি টাকা বেড়েছে।
আগামী মাসে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরে আসার কথা রয়েছে। সফরকালে তারা অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থা, রাজস্ব খাতের সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি খাতের নীতিগত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করবে। পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির আকার ও শর্ত নিয়েও আলোচনা হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন ঋণ কর্মসূচি সরকারের জন্য একদিকে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করবে, অন্যদিকে ব্যাংক খাতের সুশাসন, কর আদায় বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্কারের মতো কঠিন বিষয়গুলো বাস্তবায়নের চাপও বাড়াবে। ফলে আইএমএফের সঙ্গে নতুন আলোচনার ফলাফল আগামী কয়েক বছরের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।


