চলতি আমন মৌসুমে দেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ কৃষি জেলা জয়পুরহাট ও মেহেরপুরে সারের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জয়পুরহাটে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে মেহেরপুরে দেখা দিয়েছে টিএসপি সারের তীব্র সংকট। কোনো ধরনের ক্রয় রসিদ বা মেমো ছাড়াই ইচ্ছেমতো চড়া দামে সার কেনাবেচা করছে স্থানীয় সিন্ডিকেট। এভাবে অতিরিক্ত দামে সার কিনে আমন আবাদের উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কার মুখে পড়েছেন সাধারণ কৃষকরা।
জয়পুরহাটে সরকারি দামের তোয়াক্কা নেই
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জয়পুরহাটে ৭০ হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ৯৭ শতাংশ জমিতে রোপণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে ধানক্ষেতের পরিচর্যা শুরু করতেই বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। খুচরা ডিলার ও ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দাম হাঁকাচ্ছেন।
খুচরা বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও কৃষকদের তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকায়। একইভাবে ১ হাজার ৩৫০ টাকার টিএসপি সার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকায়, ১ হাজার ৫০ টাকার ডিএপি সার ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় এবং ১ হাজার ৫০ টাকার এমওপি সার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ টাকায়।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, দোকানে মূল্যতালিকা ঝোলানো থাকলেও বাস্তবে অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে। কৃষকরা দামের প্রতিবাদ করলে বা ক্রয়মেমো চাইলে ডিলার ও বিক্রেতারা সার দিতেই অস্বীকৃতি জানান। সার নিয়ে কৃষকদের এই দুর্ভোগের কথা স্বীকার করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ। তাদের মতে, নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো হলে কৃষকরা এই হয়রানি থেকে রক্ষা পাবেন।
তবে জেলা সার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রওনকুল ইসলাম চৌধুরী দাবি করেছেন, চাহিদার তুলনায় সারের প্রাপ্যতা কিছুটা কম হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো সমস্যা পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) কোনো ডিলার নির্ধারিত দামের বেশি নিচ্ছেন না বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক একেএম সাদিকুল ইসলাম জানান, জেলাজুড়ে প্রতিটি ডিলার পয়েন্টে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ফোন নম্বর টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সারের দাম বেশি নেওয়ার সত্যতা ও প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মেহেরপুরে টিএসপির প্রকট সংকট ও কৃত্রিম অস্থিরতা
এদিকে মেহেরপুরের সার্বিক পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল। চলতি মৌসুমে জেলাটিতে ২৬ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হলেও প্রয়োজনের তুলনায় সার বরাদ্দ অত্যন্ত কম। আমন মৌসুমে ইউরিয়া, এমওপি, টিএসপি ও ডিএপি সারের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও বরাদ্দের পরিমাণ মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। বিশেষ করে টিএসপি সারের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। সরকারি ডিলারের দোকানে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও ৫ থেকে ১০ কেজির বেশি টিএসপি মিলছে না কৃষকদের।
ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, ১ হাজার ৩৫০ টাকা মূল্যের টিএসপি সার ক্ষেত্রবিশেষে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকানো হচ্ছে। যদি বাকি বা ধারে নেওয়া হয়, তবে দাম আরও বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে। বাধ্য হয়েই কৃষকদের উচ্চমূল্যে সার কিনতে হচ্ছে। অনেক কৃষক পর্যাপ্ত সার না পেয়ে আট-দশ বিঘা জমির আবাদ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) মেহেরপুর জেলা শাখার সভাপতি হাফিজুর রহমান হাফি জানান, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট চলছে টিএসপি সারে। চাহিদার তুলনায় চাহিদানুযায়ী চার ভাগের এক ভাগ সারও পাওয়া যাচ্ছে না। তবে সার বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সনজীব মৃধা জানান, মেহেরপুরে একই জমিতে বছরে তিন থেকে চারবার ফসল চাষ করা হয়, যার ফলে অতিরিক্ত সারের প্রয়োজন পড়ে এবং এই ঘাটতির সৃষ্টি হয়।
সার সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়ে মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় বলেন, কৃষি বিভাগকে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে দ্রুত এই সংকট কেটে যাবে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ধানখোলা ইউনিয়নের যুগিন্দা বাজারে ২০ বস্তা সারসহ একটি অটোভ্যান আটক করেন স্থানীয়রা। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে অটোভ্যানচালক শাহাবুল ইসলামকে ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। গাংনী উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা আরাফাত মিয়া জানান, আটক করা ওই ২০ বস্তা সার পরবর্তীতে সরকারি মূল্যে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে বিক্রি করা হয়েছে।


