Homeঅর্থনীতিব্রোকারদের জালিয়াতিতে গভীর সংকটে শেয়ারবাজার

শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
ব্রোকারদের জালিয়াতিতে গভীর সংকটে শেয়ারবাজার

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার নানা উদ্যোগের পরও ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অনিয়ম থামছে না। কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ক্রমেই গুরুতর হয়ে উঠেছে। গত দুই বছরে অন্তত ২৫টি ব্রোকারেজ হাউসের কনসোলিডেটেড কাস্টমারস অ্যাকাউন্ট বা সিসিএ থেকে শত শত কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া বা ঘাটতির তথ্য সামনে এসেছে।

শুধু গ্রাহকের অর্থের অনিয়মই নয়, বড় ধরনের জালিয়াতি ও বিদেশে অর্থ পাচারসহ একাধিক কারণে অন্তত ২২টি ব্রোকারেজ হাউস বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে আর্থিক অনিয়ম, গ্রাহকের অর্থ ফেরত না দেওয়া, সিসিএ ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধি লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্রোকারেজ হাউসের যোগসাজশেই শেয়ারবাজারে গুজব তৈরি করে নানা কারসাজি করা হয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা যেভাবে লুটপাট করা হয়েছে তা বড় ধরনের অন্যায়। যারা এসব অনিয়মে জড়িত, তাদেরকে শেয়ারবাজারে আজীবন নিষিদ্ধসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও বিশ্লেষকরা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিদর্শনে একের পর এক কেলেঙ্কারি

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) পরিদর্শনে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সিসিএ ঘাটতি ধরা পড়েছে। চলতি আগস্টে ব্রোকারেজ হাউস হাজী আহমেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে একাধিক আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পায় বিএসইসি। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি নগদ টাকা উত্তোলন, একই ইমেইল, মোবাইল ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে একাধিক বিও অ্যাকাউন্ট খোলা এবং সমন্বিত গ্রাহক হিসেবে ২ কোটি ৯ লাখ টাকার বেশি ঘাটতির অনিয়ম পাওয়া গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটিকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

ডিএসই সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে সালতা ক্যাপিটাল নিয়েও বড় ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে। বিএসইসির তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি টাকার গ্রাহক অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় ২৭ কোটি টাকা নগদ অর্থ এবং প্রায় ৭২ কোটি টাকার শেয়ার রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ১৪ হাজার গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এদিকে এনআরবিসি সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারীদের গ্রাহক ব্যাংক হিসাবে ৫২ কোটি টাকার ঘাটতি ধরে বিএসইসি। এরপর প্রতিষ্ঠানটি মূল ব্যাংক থেকে সমপরিমাণ অর্থ এনে ঘাটতি পূরণ করলেও কদিন বাদেই আকস্মিক পরিদর্শনে দেখা যায় সেই অর্থ আবার ফেরত চলে গেছে। ফলে কার্যত গ্রাহকের ৫২ কোটি টাকার কোনো হিসাব দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

তবে সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলোর একটি মশিহর সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে। তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ১৬১ কোটি টাকা গ্রাহকের নগদ অর্থ ও শেয়ার ব্যবহারের অভিযোগ উঠে আসে। এর মধ্যে প্রায় ৬৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা নগদ এবং ৯২ কোটি টাকার বেশি মূল্যের শেয়ার জড়িত ছিল।

পুরোনো ও চলমান অনিয়ম

বিএসইসির পরিদর্শনে সিসিএ ঘাটতির তালিকায় রয়েছে পিএফআই সিকিউরিটিজ, সিনহা সিকিউরিটিজ, ফারইস্ট স্টকস অ্যান্ড বন্ডস ও ধানমন্ডি সিকিউরিটিজ। বিগত এক প্রতিবেদনে এই চার প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত সিসিএ ঘাটতি পাওয়া যায় প্রায় ১২৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে পিএফআই সিকিউরিটিজের ঘাটতি ছিল প্রায় ২৮ কোটি ১৮ লাখ, সিনহা সিকিউরিটিজের ৮ কোটি ৪৯ লাখ, ফারইস্ট স্টকস অ্যান্ড বন্ডসের ১০ কোটি ৮ লাখ এবং ধানমন্ডি সিকিউরিটিজের ৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।

২০২০ সালে গ্রাহকদের ১২৬ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর তামহা সিকিউরিটিজ গ্রাহকদের ১৪০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া গ্রাহকের অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে সিলনেট সিকিউরিটিজ, মোহররম সিকিউরিটিজ, সিলেট মেট্রো সিটি সিকিউরিটিজ, ট্রেন্ডসেট সিকিউরিটিজ ও ফার্স্টলিড সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে। তামহা সিকিউরিটিজ, ব্যাংকো সিকিউরিটিজ এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর অ্যান্ড কোম্পানির মতো পুরোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও গ্রাহকের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

অন্যদিকে, বড় অনিয়ম না হলেও গ্রাহকের হিসাবে অননুমোদিত লেনদেন, ভুয়া পোর্টফোলিও স্টেটমেন্ট, গ্রাহকের মোবাইল নম্বর পরিবর্তন, সিসিএ ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংরক্ষণ না করার মতো অভিযোগে ইউসিবি স্টক ব্রোকারেজ, এনবিএল সিকিউরিটিজ, আইল্যান্ড সিকিউরিটিজ ও প্রুডেনশিয়াল ক্যাপিটালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ব্যবস্থা নিয়েছে বিএসইসি।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার বক্তব্য ও বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ

বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম জানান, গত কয়েক বছরে কিছু ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়ায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে কেউ যেন অনিয়ম করতে না পারে, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং লুটপাটকারীদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ব্রোকারেজ হাউসের মালিকেরাই নানা অনিয়মে জড়িত থেকে গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এদের কারণে হাজার হাজার বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং শেয়ারবাজারে আস্থা নষ্ট হয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর উচিত সব ব্রোকারেজ হাউসে নিয়মিত পরিদর্শন পরিচালনা করা এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী পরিদর্শন টিম গঠন করা।

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বাধিক পঠিত

সাম্প্রতিক মন্তব্য