এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান এবং শেয়ারবাজারের আলোচিত উদ্যোক্তা মোহাম্মদ আদনান ইমামের নামে যুক্তরাজ্যে ১৬টি বিলাসবহুল বাড়ি ও ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করে তিনি সেখানে এ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। শুধু তা-ই নয়, নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান জেনেক্স ইনফোসিসের নামে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে ৩১৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা ভিন্ন খাতে স্থানান্তরের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন।
বিএফআইইউর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউসিবির সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান রনি ও আদনান ইমাম ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আনিসুজ্জামান রনির বড় ভাই সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদ, যিনি বর্তমানে বিদেশে পলাতক। পারস্পরিক যোগসাজশে বৈশ্বিক বাণিজ্যের আড়ালে জেনেক্স ইনফোসিসের অনুকূলে ইউসিবি থেকে ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ অনুমোদন করিয়ে তা বিদেশে পাচার করা হয়। অনুসন্ধানের এই প্রতিবেদন শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতে পাঠিয়েছে বিএফআইইউ। সেখানে আদনান ইমামের নিয়ন্ত্রণাধীন শেয়ার হস্তান্তর ও বিক্রয়ের ওপর জরুরি ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
শেয়ার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা ও বিএফআইইউর পদক্ষেপ
জানতে চাইলে বিএফআইইউর প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন জানান, আদনান ইমামের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিএসইসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন শেয়ার যাতে বিক্রি বা হস্তান্তর করা না যায়, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম জানান, বিএফআইইউর চিঠির বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে আইন ও বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। জেনেক্স ইনফোসিসের শেয়ারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ব্যাংক খাতের টাকা আত্মসাৎ ও জালিয়াতির চিত্র
বিএফআইইউর ২০২১-২৪ মেয়াদের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইউসিবি থেকে জেনেক্স ইনফোসিসকে ৩১৫ কোটি ২০ লাখ টাকার ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড সুবিধা দেওয়া হয়। ঋণ বিতরণে আর্থিক সক্ষমতা, নগদপ্রবাহ ও জামানতের পর্যাপ্ততা যাচাই না করেই টাকা ছাড় করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার না করে পুরনো ঋণ সমন্বয় ও পুনঃতফসিলের ডাউনপেমেন্ট হিসেবে দেখিয়ে আসল খেলাপি ঋণ আড়াল করা হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির অনুকূলে ইস্যু করা অধিকাংশ এলসি ফোর্স লোন ও টার্ম লোনে রূপান্তরের মাধ্যমে সমন্বয় দেখানো হলেও আমদানি করা পণ্য ব্যবসায় ব্যবহৃত হয়নি। কার্যাদেশ দেখিয়ে নেওয়া ২৯ কোটি টাকার ঋণও ব্যাংকে ফেরত আসেনি। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়, বৈদেশিক বাণিজ্যের ছদ্মবেশে মূল অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বর্তমানে এই চক্রটির কাছে শুধু ইউসিবিরই প্রায় ১ হাজার ১৭ কোটি টাকার ঋণ মন্দমানের খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
২৪০০ কোটি টাকার ঋণের পাহাড় ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের চেষ্টা
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, আদনান ইমাম নিজের নামে ইউসিবিসহ ১৩টি ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা এবং কর্মচারীদের নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান খুলে আরও ১ হাজার ৩৩ কোটি টাকা মোট ২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। বেনামি কোম্পানি ‘ফুলপুর অ্যাগ্রো লিমিটেড’-এর নামে নেওয়া ঋণে কেনা ১৫ কোটি টাকা দামের একটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করেছে ইউসিবি কর্তৃপক্ষ।
অন্যদের নামে নেওয়া এসব অদৃশ্য ঋণের মধ্যে রয়েছে—ইক্সোরা অ্যাপারেলসের নামে ১২৬ কোটি, জেনেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের নামে ২৩০ কোটি, টিএসএন ট্রেডের নামে ২৬৭ কোটি, বাংলা-ইউকে অ্যাগ্রোর নামে ৩৮০ কোটি এবং ডায়মন্ডরিজ কনস্ট্রাকশনের নামে ৩০ কোটি টাকা। এসব ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় অর্থঋণ আদালতে মামলা করেও সমুদয় অর্থ উদ্ধার নিয়ে ঘোর সংশয় দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের নাগরিক (পাসপোর্ট নম্বর-১২৪৩৩৮-৩৯৭) আদনান ইমাম আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে পলাতক রয়েছেন। ইতিমধ্যেই বিএফআইইউ আদনান, তাঁর স্ত্রী নাদিয়া মোমিন ইমাম, বাবা চৌধুরী ফজলে ইমাম ও মা নিলুফার ইমামের সব ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করেছে এবং দুদক তাঁদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
কঠোর সংস্কারের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
ব্যাংক খাত ও বাণিজ্য জালিয়াতি রোধে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “কেবল পাচার করা অর্থ ফেরত আনার ওপর নির্ভর না করে পাচারের পথগুলো চিরতরে বন্ধ করতে হবে। এ জন্য আন্তর্জাতিক কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড (সিআরএস) চুক্তিতে স্বাক্ষর করা এবং প্রকৃত মালিকানা চিহ্নিত করতে ‘বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।”


